Image description
সংসদ নির্বাচনই এজেন্ডা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে-

 
  • বিএনপি মনে করে, সংস্কারের প্রশ্নে জোর করে গণভোট চাপিয়ে দিলে তা রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে।
  • গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’- যেকোনো অবস্থান নিলে জোটের শরিকদের মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে চলে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
  • নির্বাচনকে ছাপিয়ে গণভোট সামনে এলে ভোটের মূল রাজনীতি দুর্বল হতে পারে, যা বিএনপি কোনোভাবেই চায় না।

জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কারগুলোর ওপর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন আলাদা ব্যালটে যে গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিএনপির কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক ভাবনা বা প্রচার নেই। দলটির প্রধান ফোকাস একান্তভাবেই সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী এজেন্ডা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং জোটগত কৌশল- সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে কিভাবে জাতীয় নির্বাচনে দল ও জোটের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে সংসদে আসতে পারে।

এই বাস্তবতায় গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোট চাওয়ার কোনো প্রচার-প্রচারণায় নামছে না বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার জনগণের। এটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারের দায়িত্ব সরকারের। বিএনপি সংসদের বাইরে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকলেও, গণভোটকে তারা নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে চাইছে না।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূল সোপান। সেই নির্বাচনকে ছাপিয়ে গণভোটকে সামনে আনা হলে নির্বাচনী রাজনীতি বিভ্রান্ত হবে এবং মাঠপর্যায়ে জোটের ঐক্যে টান ধরতে পারে। ফলে দলটি সচেতনভাবেই গণভোট প্রশ্নে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখছে।

কী নিয়ে গণভোট

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন আলাদা একটি ব্যালটে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’- এই দুই বিকল্পের মাধ্যমে মতামত দেবেন। প্রশ্নটি হবে-

আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নি¤œলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?

এই প্রশ্নের আওতায় চারটি বিষয়ের ওপর একত্রে মতামত নেয়া হবে-

১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী গঠিত হবে।

২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০টি সংস্কার বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে।

৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে।

সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ভোট নেয়া হবে। ইতোমধ্যে গণভোটের পক্ষে সরকারি পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণাও শুরু হয়েছে।

বিএনপির অবস্থান : সংস্কারের পক্ষে, আদেশের বিপক্ষে

গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি সংস্কারের বিরোধী নয়। বরং দীর্ঘ আলোচনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে যে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটির বাস্তবায়নই চেয়েছিল বিএনপি।

তবে তার অভিযোগ, সনদে স্বাক্ষরের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত সনদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই আদেশ বিভ্রান্তিকর এবং এতে সনদের মৌলিক কাঠামো থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে।

তার ভাষায়, ‘বিএনপি রাজনৈতিক মতৈক্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই সনদের বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু সেই সনদের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একতরফাভাবে যে আদেশ দেয়া হয়েছে, সেটি আমরা সমর্থন করতে পারি না।’

‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে মূল বিরোধ

গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। এরপর ২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। এখান থেকেই বিতর্ক শুরু হয়।

৩০ অক্টোবর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে কমিশনের প্রস্তাব একপেশে এবং জোরপূর্বক জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

জানা গেছে, জুলাই সনদে স্বাক্ষরের আগের দিন সনদের পাদটীকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করা হয়। সেখানে বলা হয় যে- সংস্কারে যে দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে, তারা নির্বাচনী ইশতেহারে তা উল্লেখ করতে পারবে এবং নির্বাচনে জয়ী হলে সংসদে সে অনুযায়ী বাস্তবায়নের এখতিয়ার থাকবে।

কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে এই পাদটীকা এবং ভিন্নমতগুলো বাদ দেয়া হয়। বিএনপির আপত্তির মূল জায়গা এখানেই। দলটির দাবি, শুধু বিএনপিই নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ও উপেক্ষা করা হয়েছে।

সংখ্যার হিসাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নেয়। আলোচনায় আসে ১৬৬টি সংস্কার প্রস্তাব। এর মধ্যে ৮২টি প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তিতে বাদ পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তবে এই ৮৪টির মধ্যে ৬১টিতেই কোনো না কোনো দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। বিভিন্ন ধাপ বিবেচনায় নিলে ভিন্নমতের সংখ্যা শতাধিক। সবচেয়ে বেশি ভিন্নমত দিয়েছে বামপন্থী দলগুলো। বিএনপি সাতটি মৌলিক সংস্কারে ভিন্নমত জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিও কয়েকটি প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে।

বিএনপির বক্তব্য, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের মতো বিষয়ে তারা ভিন্নমত দিয়েছে। এসব বিষয়ে গণভোটের মাধ্যমে বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে তা রাজনৈতিক ঐকমত্যের পরিপন্থী হবে।

গণভোট বনাম নির্বাচন : রাজনৈতিক বাস্তবতা

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গণভোটে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ সংসদকে কেন্দ্র করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, উচ্চকক্ষ চালু হবে এবং একাধিক মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন কার্যকর হবে। অর্থাৎ গণভোটের ফল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবু বিএনপি এই প্রশ্নে সক্রিয় হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে-

এক. বিএনপি মনে করে, সংস্কারের প্রশ্নে জোর করে গণভোট চাপিয়ে দিলে তা রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে। দুই. গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’- যেকোনো অবস্থান নিলে জোটের শরিকদের মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে চলে আসার ঝুঁকি রয়েছে। তিন. নির্বাচনকে ছাপিয়ে গণভোট সামনে এলে ভোটের মূল রাজনীতি দুর্বল হতে পারে, যা বিএনপি কোনোভাবেই চায় না।

ফলে দলটি কৌশলগতভাবে গণভোটকে সরকারের বিষয় হিসেবে রেখে নিজেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখছে।

নির্বাচনী ইশতেহারে জুলাই সনদ

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জুলাই সনদের প্রসঙ্গ রাখবে। তবে তারা গুরুত্ব দেবে সনদের সেই পাদটীকায় উল্লিখিত বিষয়টিতে- যেখানে বলা হয়েছে, ভিন্নমত থাকা সংস্কারগুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের এখতিয়ার থাকবে।

অর্থাৎ বিএনপি সংসদ নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখছে। গণভোটকে তারা সরকারের উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির এজেন্ডার কেন্দ্রে এখন শুধু একটিই বিষয়- জাতীয় সংসদ নির্বাচন।