বিএনপির সাথে দীর্ঘদিন যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর মধ্যে যারা বিএনপির পক্ষ থেকে আসন ছাড় না পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাদের অনেককে সরকারে অংশগ্রহণের আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শরিক নেতারা।
গতকাল মঙ্গলবার গণফোরামসহ যুগপৎ জোটের একাধিক আসনবঞ্চিত শরিক দলের নেতাদের সাথে কথা হলে তারা নয়া দিগন্তকে এ তথ্য জানান।
নির্বাচনে অংশ না নেয়া এসব শরিক নেতা আশঙ্কা করছেন, যারা নিজ দলের প্রতীকে আসন ছাড় না পেয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন, তাদের বেশির ভাগই বিজয়ী হবেন না। এতে ওই আসনগুলো জামায়াত জোটের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ দিকে শরিক দলগুলোকে যেসব আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে, সেসব আসনসহ সারা দেশে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, সারা দেশে শরিকদের বিরুদ্ধে মনোনয়ন দাখিল করা ৯ জন নেতাকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া বাকি বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে দলটি।
বিএনপির দলীয় সূত্রে আরো জানা যায়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। একই সাথে কয়েকটি আসনে যেখানে ভুলবশত বা পরিস্থিতিগত কারণে দলের দুইজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়া আসনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করে দলীয় নির্দেশনা জানানো হচ্ছে। দ্রুত তাদের সাথে বসে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত বিএনপি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে। এরপরও কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত না মানলে বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমনকি নেপথ্যে কোনো নেতা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সারা দেশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬১ আসনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এসব প্রার্থীর ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে ভবিষ্যতে কোনো কমিটিতে তাদের জায়গা দেয়া হবে না। এবার কোনো ছাড় নেই, কারণ প্রার্থী কে তা বড় নয়, ধানের শীষের বিজয়ই বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য।
এ দিকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগ মুহূর্তে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য না করার ব্যাপারেও কঠোর সতর্কবার্তা দেন। এরপরও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শরিকদের চারটি আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী : সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে ছাড় দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ আরো দুই নেতা।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। অথচ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন।
ঢাকা-১২ আসনে সাইফুল হককে ছেড়ে দেয়ার পরও দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এই চারটি আসনেই নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ে মনোনয়ন বৈধ হয়েছে।
ইতোমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শরিকদের আসনে প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ ৯ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শরিক দলের বক্তব্য : বিএনপির শরিক দলগুলো বলছে, বিএনপির পক্ষ থেকে তারা সর্বপ্রকার সহযোগিতা পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে যেসব সমস্যা বা ব্যবধান রয়েছে, তা দ্রুতই সমাধান হবে। নির্বাচনে জয়লাভের ব্যাপারে তারা শতভাগ আশাবাদী।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নয়া দিগন্তকে বলেন, “কেন্দ্রীয় বিএনপি আমাদের ব্যাপারে আন্তরিক। তবে বিগত সময়ে আমার নির্বাচনী আসনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কমিটিগুলো হাসান মামুনের অনুসারীদের দিয়ে গঠন করা হয়েছিল। ফলে বর্তমান কমিটিগুলো এখনো আমাকে সহযোগিতা করছে না। তবে সাবেক নেতারা পাশে আছেন। আশা করছি বিএনপি দ্রুত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে।”
নির্বাচনে অংশ না নেয়া যুগপৎ শরিক ও গণফোরামের কার্যকর সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, “এবার যার যার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে, তাই আসন ভাগাভাগির পথে আমরা যাইনি। কারণ এতে একটি পক্ষ সুবিধা পেয়ে যেত। তবে বিএনপি আমাদের উচ্চকক্ষে আসনসহ সরকারে অংশগ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে।”
ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, “বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের জাতীয় সরকারে অংশগ্রহণের আশ্বাস দেয়া হয়েছে। তাই আমরা বিএনপিকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি না।”
বাংলাদেশ জনঅধিকার পার্টির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল সম্রাট বলেন, “বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারে অংশগ্রহণের আশ্বাস পেয়েছি। তাই আমরা নির্বাচন থেকে বিরত রয়েছি।”
বিএনপির বক্তব্য : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব আসনেও যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ১৯ তারিখ পর্যন্ত আমরা বোঝানোর চেষ্টা করব। এরপরও না মানলে বহিষ্কারসহ আরো কঠোর সিদ্ধান্ত আসবে।”