Image description
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেলসি রদ্রিগেজের শপথ

ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় অপসারণে কারাকাসের আকাশে এখন অনিশ্চয়তার ঘনঘটা। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার পর স্থানীয় সময় সোমবার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। তবে এ ক্ষমতার পালাবদলের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—রদ্রিগেজ কি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শর্ত মেনে সমঝোতার পথে হাঁটবেন, নাকি পূর্বসূরির মতো সংঘাতের পথ বেছে নেবেন?

আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া মাদুরো নিউইয়র্কের একটি আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে যখন আইনি লড়াই লড়ছেন, ঠিক সেই সময়েই তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন, যিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। শপথ নেওয়ার পর ৫৬ বছর বয়সী ডেলসি রদ্রিগেজ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দেওয়া ভাষণে মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার ‘অপহৃত বীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি মাদুরো ও ফার্স্টলেডি সিলিয়া ফ্লোরেসের মুক্তির জন্য একটি বিশেষ কমিশনও গঠন করেছেন। তবে ভাষণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি রদ্রিগেজের সুরে কিছুটা নমনীয়তা রয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আমাদের অঞ্চল যুদ্ধ নয়, বরং শান্তি ও সংলাপের দাবিদার।’ রদ্রিগেজের এ আহ্বানকে অনেক বিশেষজ্ঞ ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি গোপন সমঝোতার আভাস হিসেবে দেখছেন।

এদিকে, হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন মার্কিন নিয়ন্ত্রণে বা ‘রান’ করার পর্যায়ে রয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, রদ্রিগেজ যদি মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় বিশেষ করে মাদক পাচার রোধ এবং তেল খাতের সংস্কারে সহযোগিতা না করেন, তবে তাকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার ভেঙে পড়া অবকাঠামো মেরামত করবে এবং সেই অর্থ ভেনেজুয়েলার জনগণের উন্নয়নের পাশাপাশি আমেরিকার পাওনা পরিশোধে ব্যবহার করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য বলেছেন যে, তারা সরাসরি দেশ শাসন করতে চান না, তবে ভেনেজুয়েলার ভূমি যেন আমেরিকাবিরোধীদের আস্তানা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে চান।

এরই মধ্যে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার পর দেশটির বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উত্তোলনে তোড়জোড় শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তোলন বাড়াতে কয়েকদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

গত শনিবার মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেল খাত ‘নিজেদের কাছে নেওয়ার’ কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তার ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আসন্ন বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর আবার ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করতে পারে মার্কিন কোম্পানিগুলো।

বৈঠকের বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেইলর রজার্স বলেছেন, ‘আমাদের সব তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় বড় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী এবং প্রস্তুতও রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলা হবে, যা মাদুরোর অবৈধ সরকারের আমলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।’

ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী বর্তমানে ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। তবে ট্রাম্পের ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ বা সেনা মোতায়েনের হুমকির মুখে রদ্রিগেজ কতটা সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ চাপ আর অন্যদিকে ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবের মধ্যে রদ্রিগেজকে এক কঠিন ‘টাইটরোপ’-এ হাঁটতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা কি একটি স্থিতিশীল রূপান্তরের দিকে যাবে, নাকি নতুন কোনো অস্থিরতার মুখে পড়বে, তা আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে উঠবে।

অন্তত ১৮ মাস ভেনেজুয়েলা নিয়ন্ত্রণ করতে চান ট্রাম্প: ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির পরিকল্পনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো ‘ঠিকঠাক’ করতে তার প্রশাসনের অন্তত ১৮ মাস সময় লাগতে পারে।

নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর এই প্রথম ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা নিয়ে তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দেশটিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরানো পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাবাসীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কোনো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল ক্ষেত্রগুলো পুনর্গঠনে বড় ধরনের বিনিয়োগ করবে, যা পরবর্তী সময়ে ভর্তুকি বা আয়ের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হবে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স জানিয়েছেন, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করতে অত্যন্ত আগ্রহী। এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করার জন্য ট্রাম্প একটি উচ্চপর্যায়ের দল গঠন করেছেন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও সতর্ক করে দেন যে, ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা না করেন, তবে দেশটিতে দ্বিতীয়বার সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই অভিযান চালানো নিয়ে সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার সমর্থকরা তার এই সাহসী কাজগুলো পছন্দ করে এবং তিনি যা করছেন তা নিয়ে তিনি গর্বিত। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রভাব বিস্তারের এক দীর্ঘস্থায়ী ও অনমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প।

ট্রাম্পের পদক্ষেপ মানবতার পথে বড় অগ্রগতি, বললেন মাচাদো: ভেনেজুয়েলায় নজিরবিহীন অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো। শান্তিতে নোবেলজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলের এই নেত্রী ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘মানবতা ও স্বাধীনতার পথে বড় অগগ্রতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

মাচাদো আরও বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য। ভেনেজুয়েলায় তার পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বকে তা প্রমাণ করেছেন এবং এটি ‘মানবতার জন্য বিশাল পদক্ষেপ’।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে স্ত্রীসহ গত শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি আটককেন্দ্রে রাখা হয়। মাদক পাচার ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অভিযোগে দুদিন পর তাদের নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে মাদুরো নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

অন্যদিকে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মাচাদো ফক্স নিউজকে বলেন, নতুন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ, যিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাকে ‘বিশ্বাস করা যায় না’।

মাচাদো যখন এই মন্তব্য করেন, তার কিছুক্ষণ আগেই নিউইয়র্কের ওই আদালতে মাদুরো তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনা মাদক পাচার ও অস্ত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ৩০ মিনিটের শুনানিতে মাদুরো নিজেকে ‘অপহৃত প্রেসিডেন্ট’ এবং যুদ্ধবন্দি হিসেবে দাবি করেন এবং বলেন, তিনি এখনো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট।

প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেব, ট্রাম্পকে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হুমকির মুখে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনে তিনি নিজের শপথ ভেঙে আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নিতে প্রস্তুত।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন অভিযানে আটকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কলম্বিয়াকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন এবং দেশটিকে একটি ‘দুর্বল দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি পেত্রোকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বলেন, ‘পেত্রো একজন দুর্বল মানুষ, যিনি কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করেন। তাকে খুব বেশিদিন এটা করতে দেওয়া হবে না।’ এমনকি কলম্বিয়ায় ভেনেজুয়েলার মতো একই ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প।

পেত্রোর পাল্টা জবাব, ট্রাম্পের এই মন্তব্যের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ক্ষোভ উগরে দেন সাবেক বামপন্থি সশস্ত্র যোদ্ধা গুস্তাভো পেত্রো। তিনি বলেন, ‘আমি শপথ করেছিলাম আর কখনো অস্ত্র স্পর্শ করব না; কিন্তু মাতৃভূমি আক্রান্ত হলে আমি ফের অস্ত্র তুলে নেব।’ তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কলম্বিয়ায় কোনো ধরনের সহিংস হস্তক্ষেপ করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।

‘ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা’: ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ‘আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতিকে অবজ্ঞা করেছে’ বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক উচ্চ কমিশন বা ওএইচসিএইচআর। জেনেভায় সাংবাদিকদের উদ্দেশে কমিশনের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, ‘কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া বা বলপ্রয়োগ করা উচিত নয় অন্য কোনো দেশের।’

এই সমালোচনা এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের পর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি মিত্র দেশও ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্থায়ী উপ-প্রতিনিধি জয় ধর্মাধিকারী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মাদুরোর আটক ‘বিরোধ নিষ্পত্তির শান্তিপূর্ণ নীতির পরিপন্থি এবং বলপ্রয়োগ না করার নীতিরও পরিপন্থি’।