Image description

জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট গঠনের পর থেকেই চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়েছে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি। 

এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ইতোমধ্যে দলটির শীর্ষ পদে থাকা অন্তত ১৭ জন পদত্যাগ করেছেন। 

পদত্যাগকারী নেতারা বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি থেকে সরে আসায় এবং ‘জামায়াত ট্যাগ’ এড়াতে দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তারা।

পদত্যাগের তালিকায় আরও অনেক শীর্ষ নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। কখন কে, কোন সময় পদত্যাগ করবেন-দলটি আন্দাজই করতে পারছে না। 

বর্তমানে দলের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যেও আদর্শিক বিষয়গুলো নিয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন দলের হাইকমান্ড। এমন পরিস্থিতিতে দলটি একধরনের টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে।

সম্প্রতি পদত্যাগ করা এনসিপি নেত্রী নীলিমা দোলা বলেছেন, ‘দলের নেতাকর্মীদের চোখে ধুলা দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা হয়েছে এবং মনোনয়ন দেওয়ার নাম করে তীব্র প্রতারণা করা হয়েছে। এনসিপি এখন সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থি ঘরানায় ঢুকে পড়ছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।

বিষয়টিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ মনে করছে, এই জোট এনসিপির জন্য একটি ‘আদর্শিক ঝুঁকি’। তাছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শক্তির এভাবে বিভক্ত হওয়া হতাশাজনক। 

এনসিপি নিজেকে একটি মধ্যপন্থি দল হিসাবে দাবি করলেও জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মাধ্যমে তাদের সেই অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে। এ জোটের কারণে এনসিপির নিজস্ব মধ্যপন্থি আদর্শ বিলুপ্ত হয়েছে। এখন দলটি একটি ডানপন্থি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। 

 

এনসিপি থেকে পদত্যাগকারীরাসহ দলটির ভেতরের একটি বড় অংশ মনে করছে-এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্খার পরিপন্থি।

জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার পর থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে নতুন এ রাজনৈতিক দলটি। তবে এর আগে থেকেই দলের ভেতর-বাইরে নেতৃত্বের দুর্বলতা, স্বেচ্ছাচারিতা, জুলাই যোদ্ধা ও সাধারণ জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়গুলো আলোচনা-সমালোচনায় আসতে থাকে। 

এ অবস্থায় এনসিপি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ছে। ইতোমধ্যে দল থেকে পদত্যাগী নেতা মুনতাসীর মাহমুদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে ‘তৃণমূল এনসিপি’। এই ব্যানারে একাধিক কর্মসূচিও পালন করা হচ্ছে। পদত্যাগ করা ওই নেতা সাবেক দুই ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দুর্নীতি তদন্তের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিলও করেছেন।

জানা যায়, ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার কথা জানান এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেদিনই সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। 

শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন শীর্ষ নেতার পদত্যাগের খবর পাওয়া গেছে। মূলত জুলাইয়ের চেতনা থেকে বিচ্যুতি এবং জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতাকে আদর্শবিরোধী উল্লেখ করে প্রায় সবাই পদত্যাগ করেছেন। 

এদিকে দলটির শীর্ষ নারী নেতৃত্বে ভাঙনের সুর দিনদিন আরও তীব্র হচ্ছে। ইতোমধ্যে দল থেকে শীর্ষ নেত্রীদের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন ডা. তাজনূভা জাবীন, ডা. তানসিম জারা, সৈয়দা নীলিমা দোলা ও মনিরা শারমিন। এছাড়া শীর্ষ নেত্রী সামান্থা শারমিন, নূসরাত তাবাসসুম, ডা. মাহমুদা মিতুসহ দলটির একাধিক নেত্রী জোটের সিদ্ধান্তের বিষয়ে সরাসরি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। 

পাশাপাশি দলের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। নেত্রীদের ভাষ্য, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট-দলটির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক।

 

 

রোববার বিকালে এ প্রসঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একদিকে জামায়াতসহ ১০ দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোট, অন্যদিকে দলটির ভেতরে চলছে ভাঙন। অনেক নেতাই পদত্যাগের বিষয়ে মৌখিক ও লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন। নেত্রীরা দল ছাড়তে ব্যাকুল হয়ে উঠছেন। এমন বিষয়গুলো নিয়ে দলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সমস্যা সমাধানে করণীয় কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই নিজ নিজ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত।

তবে দলটির এমন অবস্থা কেন তৈরি হলো-এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেছেন, নানা কারণেই নতুন গড়ে ওঠা এনসিপির কোনো ভবিষ্যৎ দেখছি না। পার্টি হিসাবেও দলটি দাঁড়াতে পারবে না। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, এনসিপি বর্তমানে যে বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, নির্বাচনের পর তা আরও চরম আকার ধারণ করবে। 

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্য তরুণদের এখনই একত্রিত হওয়া দরকার। জুলাই ধরে রাখতে হলে নতুনভাবে গড়ে উঠতে হবে।