ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের প্রচারে মাঠ বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে শূন্য হওয়া আসনটিতে আগামী ২৯ অক্টোবর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন। অন্যদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আসনটিতে লড়ছেন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পরাজিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন।
দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দেলাওয়ারকে বিজয়ী করতে জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ প্রার্থীর প্রচারকাজে বাধাসহ দলীয় নেতাকর্মীদের বিএনপির লোকজন নানা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চালাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী। নির্বাচনি মাঠ নির্বিঘ্ন ও ভোট কেন্দ্র নিরাপদ করতে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে আরেকটি ‘মাগুরা মার্কা’ বিতর্কিত নির্বাচন যেন না হয়, সে বিষয়ে হুঁশিয়ার করছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
সূত্রমতে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন এক লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। ৯৭ হাজার ৮১৯ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন মির্জা ফখরুল।
তবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য হয়ে যায়। পরে ২৯ অক্টোবর ভোটের তারিখ নির্ধারণ করে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি জামায়াত ছাড়াও আরো তিনটি দলের প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন—আবদুল আলীম নিজামী (বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন—বটগাছ), হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—হাতপাখা) এবং হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (বাংলাদেশ কংগ্রেস—ডাব)।
জানা গেছে, বিগত সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী মির্জা ফখরুলের বিপরীতে প্রচার মাঠে বেশ আলোচিত ছিলেন দেলাওয়ার হোসেন। বড় ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হলেও কারচুপি, অনিয়ম ও গণনায় ত্রুটিসহ নানা অভিযোগ তোলেন জামায়াতপ্রার্থী। পাশাপাশি বিএনপির বড় নেতা হিসেবে ভোটারদের কাছে আলাদা সহানুভূতি থাকার কারণেই তিনি বিজয়ী হন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সে তুলনায় এবারের বিএনপির প্রার্থীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন, সরকার ও দলীয় কর্মকাণ্ডের নানা হিসাবনিকাশে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে অনেকের মত। তাই জামায়াত প্রার্থীকে নিয়ে নতুন আশা দেখছেন নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আমার দেশকে বলেন, ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনে আমাদের প্রার্থীর অবস্থান খুব ভালো। সুষ্ঠু ভোট হলে আমরা বিজয়ী হব ইনশাআল্লাহ।
সূত্রমতে, এ নির্বাচনে শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য দেলাওয়ার হোসেনকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তাকে বিজয়ী করতে শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন জামায়াতসহ জোটের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। নির্বাচনি এলাকার সভা-সমাবেশ ও উঠান বৈঠকসহ নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তারা। আগামী ২৪ অক্টোবর সর্বশেষ বড় নির্বাচনি সমাবেশে শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন।
নির্বাচনি মাঠের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার আমার দেশকে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে হলেও এ উপনির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া দেখা যাচ্ছে। দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটারদের একটি অংশ প্রকাশ্যে তৎপরতার পাশাপাশি অনেকে নীরবে ভোট দেবেন। ভোট কারচুপি ও কেন্দ্র দখল না হলে ইনশাআল্লাহ আমি বিজয়ী হব।
বিভিন্ন শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাসায় বাসায় গিয়ে আমাদের ভোটকর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। আমাকেই বেশ কয়েকটা গণসংযোগে বাধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আরো খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে। নানা বাধাবিঘ্নের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রাই প্রতিরোধ করছেন।
ভোটের সমতল মাঠ নিশ্চিতে প্রশাসনের ভূমিকাকে দুর্বল আখ্যায়িত করে দেলাওয়ার হোসেন আরো বলেন, এ বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ দিচ্ছি। তারা আমাদের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে আশ্বস্ত করছেন। খেলাফত আন্দোলনসহ অন্য প্রার্থীরাও নানা অভিযোগ করছেন বলে জানান তিনি।
নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে জামায়াতের এ প্রার্থী জানান, গতবার সারা দেশেই একটি পলিসি করে আমাদের হারানো হয়। আমার আসনে ভোট গণনায় ত্রুটিসহ কিছু অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তাছাড়া এখানকার প্রার্থীও বিএনপির শীর্ষ নেতা হওয়ায় মানুষের আলাদা সহানুভূতি ছিল। তবে এবার রাষ্ট্রপতির ভাইয়ের প্রার্থী হওয়া, সরকার ও বিএনপির কর্মকাণ্ডসহ সাত মাসের ব্যর্থতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাদের লোকদের হাতে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ও হতাশ। তাই তারা এখন দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে প্রস্তুত।
এদিকে নির্বাচনি গণসংযোগে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে পাড়া-মহল্লায় যেভাবে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা দেখে সন্ত্রাসীদের গডফাদারের মাথা নষ্ট হয়েছে। এজন্যই তারা বাধা সৃষ্টি করছে। তবে প্রচারে যত বেশি বাধা আসবে, জনগণ তত বেশি দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে নির্বাচনের মাঠে নেমে পড়বে।
জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনায় কেন্দ্র থেকে দায়িত্ব পালন করছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর অঞ্চলের পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম। জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের শীর্ষ নেতারা প্রচারকাজে যোগ দিচ্ছেন। এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ অন্য শরিক দলের নেতারাও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
ভোটের প্রচার কাজে অংশ নেওয়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি প্রকৌশলী রাশেদ প্রধান বলেন, ১১ দলের প্রার্থীর পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সবাই এমনকি বিএনপির একটি অংশও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চান। সুষ্ঠু ভোট হলে বিশাল ব্যবধানে তিনি জয়ী হবেন।
এদিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল সানাউল্লাহ। তবে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
গত বুধবার ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল, ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান।