দুল আজহাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগাম প্রচার-প্রচারণায় নেমেছে সরকারি দল বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত এবং নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়, গণসংযোগ, সামাজিক কর্মসূচি ও কুশল বিনিময়ের আড়ালে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন হওয়ার ঘোষণায় এবার ব্যক্তি ইমেজ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় প্রভাব বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিটির প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না থাকায় এবার নির্বাচন প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে। ফলে প্রার্থীদের নিজস্ব ইমেজ বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাই তাদের অনেকেই আগেভাগেই মাঠে নেমে পড়েছেন।
একইসঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে ব্যাখ্যা করেন বদিউল আলম মজুমদার।
প্রার্থী ঘোষণা না করলেও বিএনপিতে প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি দল বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে বেশ সরব রয়েছেন। দলটির অনেক প্রার্থী এখন ঈদ পুনর্মিলনী, কোরবানির মাংস বিতরণ কর্মসূচি, কর্মী সভা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার ও ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো শুরু করেছেন।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু টাইমসকে বলেন, দলের অনেকেই ঈদের আগে থেকে শুরু করে ঈদের পরবর্তী কয়েকদিন পর্যন্ত এলাকায় শুভেচ্ছা বিনিময়, স্থানীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ছোট পরিসরের মতবিনিময় সভার পরিকল্পনা নিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আশায় তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সক্রিয় আছেন।
সাবেরুল হক জানান, স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপারে দলের নির্দেশনা আসার পরপরই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই দলের হাই কমান্ডে আলোচনায় রয়েছে।
আগাম প্রার্থী দিয়ে মাঠে জামায়াত
জামায়াতও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। দলটি এরই মধ্যে সারা দেশে উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। নির্বাচনের আগাম প্রস্তুতিও শুরু করেছেন এসব প্রার্থী। দলটির প্রার্থীদের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বেশি মানুষের কাছে নিজেদের পরিচয় করানো। তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ ও ব্যক্তি পরিচিতি বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যশোর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও দলটির বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী গোলাম কুদ্দুস টাইমসকে বলেন, ‘বেশিরভাগ জায়গায় আমাদের প্রাথমিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। তারা ঈদকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ প্রচার-প্রচারণা চালাবেন।’
পিছিয়ে নেই এনসিপি
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিও প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। এর পাশাপাশি দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলাতেও তারা প্রার্থী ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক ও দলটির ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করতে এই নির্বাচনকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। একারণে প্রার্থীদের ঈদের সময় নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নীরবে মাঠে আওয়ামী লীগ সমর্থক
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার সরকারি ঘোষণার পর একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক না থাকলে এবার প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে নেই, তবে দলটির সমর্থক হিসেবে পরিচিত—এমন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীও নীরবে মাঠ গোছাচ্ছেন বলে বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তারা এখনই বড় পরিসরে প্রকাশ্য প্রচারণায় না গেলেও শেষ মুহূর্তে এমন অনেকের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগেভাগে প্রচারণা চালিয়ে তারা প্রশাসন এবং এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতের টার্গেট হতে চাইছেন না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সবসময়ই তৃণমূলের শক্তি যাচাইয়ের অন্যতম বড় মঞ্চ। ফলে বড় দলগুলোর পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চাইছে। ঈদকে ঘিরে বাড়তি গণসংযোগ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের তৎপরতা মূলত সেই প্রস্তুতিরই একটি অংশ।