Image description
মোঃ শাহনেওয়াজ খান চন্দন
 
আসাদুজ্জামান নূর নামটি দেখলেই হয়তো অনেকের কাছে একজন প্রতিভাবান অভিনেতার নাম মনে পড়ে। কিন্তু বিগত একটি বছর এই নামটি একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম হিসেবেই আমার স্টাডি টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কিছু নথিপত্রে এবং সাক্ষ্যের মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে, ২৬ তারিখেও পিলখানার অভ্যন্তরে যেন সেনাবাহিনী অভিযান চালাতে না পারে, সে জন্য শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি বাছাইকৃত টিমকে ২৬ তারিখ দুপুরের পরে পিলখানা ৪ নম্বর গেট এর কাছে জড়ো হতে বলেন। এই টিমের সবাই ছিলেন এমপি এবং এর মধ্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। প্ল্যান ছিল যে, এমপি'রা গ্যাদারিং করলে এবং বিডিআর সদস্যদের সাথে আলোচনার একটি নাটক করলে, এমপি'দের রেফারেন্স দিয়ে সেনাবাহিনীকে আটকে রাখা যাবে।
 
প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেলেও আমি এই সংক্রান্ত ছবি, ভিডিও বা অকাট্য প্রমাণ পাচ্ছিলাম না। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরে আমি এই সংক্রান্ত কিছু ছবি পাই যেখানে সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০০৯) আসাদুজ্জামান নূর পিলখানার চার নম্বর গেট এর ভিতরে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামী ডিএডি তৌহিদ, অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী মির্জা আজম এবং অন্যান্যদের সাথে আলোচনায় মগ্ন, ফটোসেশন করছে এবং শুধুমাত্র মুন্নী সাহার এটিএন চ্যানেলকে ব্রিফ করছে। এই ঘটনাগুলো ২৬ ফেব্রুয়ারির এমন একসময় ঘটছিল যখন পিলখানার ভিতরে পড়ে আছে অগণিত লাশ, কিছু লাশ ড্রেন দিয়ে ভেসে উঠেছে, শত শত নারী শিশু অমানবিক অবস্থায় জিম্মি হয়ে আছে এবং জেনারেল শাকিল সহ অসংখ্য অফিসারদের ভাগ্যে কি হয়েছে তা কেউ জানে না।
 
কারাগারে আসাদুজ্জামান নূরকে যখন ছবিগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি, "কি আলোচনা করছিলেন সেখানে? ডিজি এবং অন্যান্য অফিসার এবং তাদের পরিবারদের অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু বলেন নি কেন? এই হত্যাযজ্ঞ কেন ঠেকানো গেল না, সেটি নিয়ে কোথাও কোন প্রতিবাদ করেছেন?"
 
আসাদুজ্জামান নূর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি এসব ছবি তাকে দেখতে হবে এবং ঐ দিন তার ভূমিকা নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। বেশ সময় নিয়ে তিনি আমাদের যা বলেছেন তা হল এই যে, তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাই তিনি শেখ হাসিনার দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছেন এবং সেদিনও তিনি পিলখানায় যেতে চাননি, তাকে জোর করে পাঠিয়েছে, হাসিনা এভাবেই সবাইকে ব্যবহার করেছে, উনি কিছুই জানতেন না ইত্যাদি ইত্যাদি।
 
কিন্তু ঐ এমপি টিমের আরেক সদস্য মাহাবুব আরা গিনি (তিনিও কারাগারে আটক ছিলেন) আমাদের পুরো ঘটনাটাই বর্ণনা করলেন, যে কিভাবে শেখ হাসিনা সুপরিকল্পিতভাবে এমপিদের পাঠিয়ে, সেনা অভিযান যাতে কোনভাবেই না হতে পারে তা নিশ্চিত করেছিল। ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি এই দুইদিন পিলখানায় যেন সেনা অভিযান পরিচালিত না হয় সেজন্য শেখ হাসিনার প্ল্যান 'এ' ছিল তার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে প্যারালাল কমান্ড সৃষ্টি করা।
 
তবে এর পরেও সেনা অফিসাররা যদি ২৬ তারিখ অভিযান চালাতে চায় সে জন্য প্ল্যান 'বি' ছিল আসাদুজ্জামান নূর-মাহাবুব আরা গিনিদের মাধ্যমে পিলখানা চার নম্বর গেট এ আলোচনার নাটক চলমান রাখা। গিনির বক্তব্যের রেফারেন্স দিয়ে যখন আসাদুজ্জামান নূরকে ক্রস ইন্টারোগেশন করা হল তিনি তখন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন এবং ক্রমাগত শেখ হাসিনাকেই দোষ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
অথচ এর পরের টার্মেই (২০১৪ এর একতরফা নির্বাচন) তিনি শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভার সদস্য হন এবং সাংস্কৃতিক জগতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। এত সুবিধাভোগী হবার পরেও আসাদুজ্জামান নূর কি সব দায় শেখ হাসিনার উপর চাপিয়ে, তিনি কিছু না বুঝেই ব্যবহৃত হয়েছেন, এটি বলে সবকিছুর দায় এড়িয়ে যেতে পারেন?
উল্লেখ্য যে, বিডিআর হত্যাযজ্ঞ বিষয়ক জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন আসাদুজ্জামান নূরকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ এ পিলখানায় সামরিক অভিযান পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির দায়ে দোষি সাব্যস্ত করে এবং শাস্তি সুপারিশ করেছে।
 
মোঃ শাহনেওয়াজ খান চন্দন
সদস্য, জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন (বিডিআর হত্যাযজ্ঞ বিষয়ক)
সহকারী অধ্যাপক, আইইআর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।