দিনের পর দিন কারাবাস। অসুস্থ শরীর নিয়ে কখনো হুইলচেয়ারে করে আদালতে আসা- যাওয়া। তবু দমেনি লড়াই। আইনের পথেই হাঁটলেন তারা। মন্ত্রী, এমপি হওয়ার পরও এ লড়াই চালিয়ে যান। আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সশরীরে হাজিরা দিয়ে যাচ্ছিলেন। লড়াই দীর্ঘ ২১ বছরের। অবশেষে দিরাইয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা মামলা থেকে খালাস পেলেন তারা। এরা হচ্ছেন- শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ ও এমপি লুৎফুজ্জামান বাবর। তারা তিনজন ছাড়াও আরও ৬ জন এ মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। তবে অভিযুক্ত হওয়ায় আজিজ নাঈম নামে একজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় প্রদান করেন। ২০০৪ সালের ২১শে জুন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। সেদিন সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। গ্রেনেড বিস্ফোরণে যুবলীগের এক কর্মী নিহত ও ২৯ জন আহত হন। হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই ঘটনায় দিরাই থানার তৎকালীন সাব-ইন্সপেক্টর হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ২০২০ সালের ২২শে অক্টোবর লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু হয়। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না আরিফ, বাবর ও গউছ। তদন্ত শেষে আদালতে যে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে সেখানে আসামি করা হয় ওই তিনজনকে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় অভিযুক্ত ১০ আসামির মধ্যে ৬ জন জেলহাজতে, তিনজন জামিনে এবং একজন পলাতক ছিলেন। আদালতে মামলার বিচার চলাকালে মন্ত্রী, এমপিরা এসে হাজিরা দিতেন। গত মাসে মামলার শেষ শুনানির পর গতকাল রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন আদালত। ফলে সকালে জামিনে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও সরকারদলীয় হুইপ জি কে গউছ এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এমপি আদালতে হাজির হন। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল। আইনজীবীরাও আদালতে ভিড় করেন। জনাকীর্ণ আদালতে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন।
এদিকে, রায় ঘোষণার পর বেরিয়ে এসে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি আবুল হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মামলার রায়ে আজিজ নাঈম নামে একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের খালাস প্রদান করা হয়েছে। রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিফলিত হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আরিফ, বাবর ও গউছ। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন- রাজনৈতিক হয়রানির জন্য গত ফ্যাসিস্ট সরকার আমাদের এ মামলায় আসামি করে। মামলার এজাহারে আমাদের নাম ছিল না। পরে সম্পূরক চার্জশিটে নাম ঢুকানো হয়। রায়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী না দেয়ায় আমাকে একের পর এক মামলায় ফাঁসানো হয়। দীর্ঘদিন আমি কারাবন্দি ছিলাম।
আজকে যারা আমাকে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে তারা পালিয়েছে। আর আমরা খালাস পেয়েছি। তিনি বলেন- আমরা ঘটনায় জড়িত ছিলাম না। রাজনৈতিক কারণে আমাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ’র কাছে শোকরিয়া আদায় করছি। হুইপ জি কে গউছ বলেন, এই মামলায় আমাকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে দীর্ঘদিন বন্দি থাকতে হয়। আজকে রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। তিনি বলেন- আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে আমরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। এদিকে- আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আজিজ নাঈমের বাড়ি জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরে। তিনি সুরঞ্জিত সেন হত্যাচেষ্টা ছাড়া বিভিন্ন বোমা হামলা ও জঙ্গি হামলা মামলার আসামি।
এসব মামলায় প্রায় ২০ বছর জেল খাটেন আজিজ। তিনি সুরঞ্জিত সেন হত্যাচেষ্টার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৪৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন। আজিজ নাঈম সাবেক বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর সিলেটে বোমা হামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যদিও পরে এই মামলায় খালাস পান। এ ছাড়া সিপিবি’র সমাবেশে বোমা হামলা মামলা, সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর বোমা হামলা মামলা, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলারও আসামি আজিজ নাঈম। সুরঞ্জিত সেন হত্যাচেষ্টা মামলায় জেল খাটার পর সমপ্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে আজিজ নাঈমকে ফাঁসানো হয়েছে দাবি করেছেন তার ভাই। রায় ঘোষণার পর রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আজিজ নাঈমের ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ বলেন, আমার ভাইকে ফাঁসানো হয়েছে। সে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। আমরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো। রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বর থেকে কারাগারে নেয়ার সময় আসামি আজিজ নাঈমকেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।