Image description

ড. মো. ওসমান গনী

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি ইতিহাস, আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ঈমানের মহাসম্মিলন। পবিত্র মক্কা ও মদিনা সফরে মুসলমানদের মনে অতীত ইতিহাসকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগে। ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারে মুসলমানদের সীমাহীন ত্যাগ আজও মুসলমানদের আন্দোলিত করে। তারা মক্কা-মদিনাসংলগ্ন ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করে তৃপ্তি লাভ করে। অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে হৃদয় নিংড়ানো দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুভেজা নয়নে তাঁবুতে ফিরে আসে।

 

ইসলামের ইতিহাসে এমনি একটি ঐতিহাসিক হলো কেন্দ্র বদর প্রান্তর। এই বদর প্রান্তরে আকুতোভয় সাহাবিরা জীবনবাজি রেখে অসম যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন।

মদিনা মুনাওয়ারা থেকে বদরের পথে যাত্রা শুরু করলে মরুভূমির নীরবতা হৃদয়কে গভীর ভাবনায় আন্দোলিত করে। পথের দুই পাশে ধূসর পাহাড়, বিস্তৃত বালুভূমি ও প্রখর রোদ নবী যুগের আরবের কঠিন বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয়, এই পথ দিয়েই একদিন হেঁটেছিলেন নবীজি (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, পথটি হলো মদিনা থেকে কুবা, আরজ, রওহা ও সাফরা উপত্যকা অতিক্রম করে বদর প্রান্তরে যেতে হতো। এই পথটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও পানির উৎসসমৃদ্ধ ছিল। পথটির দৈর্ঘ্য ছিল ১২০/১৩০ কিমি।

বদর প্রান্তরে পৌঁছার পর হৃদয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগে। এখানেই ২ হিজরির ১৭ রমজান সংঘটিত হয়েছিল মুসলমানদের ভাগ্য নির্ধারণকারী বদর যুদ্ধ। সংখ্যায় মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান আর বিপরীতে সুসজ্জিত এক হাজার কুরাইশ সৈন্য। নবীজি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! যদি এই দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীতে তোমার ইবাদতকারী কেউ থাকবে না।’ তাঁর অনুরোধে আল্লাহতায়ালা এক হাজার ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমানদের বিজয় অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহর অশেষ সাহায্যে মুসলমানরা বিজয়ী হন। সে কারণে বদর যুদ্ধ সত্য-ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক।

বদর প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের ত্যাগ ও সাহসের কথা মনে পড়ে। কত কষ্ট, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান এবং অবিচল ছিলেন। বদরের মাটি যেন আজও তাদের আত্মত্যাগের সাক্ষ্য বহন করছে। এখানে এসে উপলব্ধি হয়, ইসলামের বিজয় তলোয়ারের শক্তিতে নয়; বরং ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল।

বদর প্রান্তরে শহীদ সাহাবিদের কবর জিয়ারত হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গ করা মহান ব্যক্তিদের স্মরণে চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। তারা ছিলেন ১৪ জন।

তাদের জীবন মুসলমানদের জন্য সাহস, নিষ্ঠা ও আত্মোৎসর্গের অনন্য দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে বদরে নিহত ৭০ মুশরিকের লাশ ফেলার গর্ত মুসলমানরা আজও ঘৃণাভরে দেখে। এছাড়া ঐতিহাসিক কূপগুলো ও আরিশ মসজিদে নবীজির দোয়ার স্থান ইসলামের প্রাথমিক যুগের সংগ্রাম জীবন্ত করে তোলে।

হজযাত্রায় ব্যস্ততার মধ্যে বদর প্রান্তরে কিছুক্ষণ অবস্থান মানুষকে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে সরিয়ে আখিরাতের চিন্তায় বিভোর করে ফেলে। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, ঈমানের জন্য ত্যাগ ছাড়া প্রকৃত সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। বদরের শিক্ষা মুসলমানকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকতে, সত্যের পথে অবিচল থাকতে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে প্রাণীত করে।

বদর সফর আত্মিক উপলব্ধির এক মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা। একজন হাজি যখন বদরের মাটিতে দাঁড়িয়ে অতীত ইতিহাস স্মরণ করেন, তখন তার হৃদয়ে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা, সাহাবিদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা এবং দ্বীনের জন্য কাজ করার নতুন প্রেরণা জেগে ওঠে।

অতএব, বলা যায়, বদর প্রান্তর পরিদর্শন কোনো আনন্দ ভ্রমণ নয়; হজযাত্রায় বদর প্রান্তরে কিছুক্ষণ অবস্থান মুসলমানদের হৃদয়ে ইসলামের ত্যাগের মহিমা, ঈমানি দৃঢ়তা ও আত্মিক অনুপ্রেরণার এক সমুজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকে। আমরাও সদলবলে ত্যাগের ওই মহিমাকে অংশত হলেও ধারণ-পূর্বক উজ্জীবিত হয়ে মদিনায় ফিরে আসি।

(বদর শহীদদের নামফলক। দক্ষিণ পাশে বিম্বিত গারকাদ বৃক্ষ ও ধূসর মরুর খণ্ডচিত্র)