ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি সে সময় রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হাইরিপ্রেজেনটেটিভও ছিলেন।
নাগিরকত্ব ইস্যুতে নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে ড. খলিলুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছিলো বিএনপি। সেই ড. খলিলুর রহমানকেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ের পর কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চলেছেন, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ছিলো। বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় এসেছিলো।
বিএনপি কেন তাকেই বেছে নিলো?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানকেই কেন বেছে নিলো বিএনপি? নতুন সরকারের প্রথম দিনেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে তিনি এই প্রশ্নের উত্তরে বাংলানিউজকে জানিয়েছিলেন, ড. খলিলুর রহমান একজন মেধাবী সরকারি অফিসার ছিলেন।
আরেক কর্মকর্তা এ প্রতিনিধিকে জানান, ড. খলিলুর রহমান দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিভিন্ন লেভেলে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক কোনো পক্ষ বিপক্ষ না নিয়ে বাংলানিউজকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিভাবে পরিচালিত হবে, সরকারের ফরেন পলিসি কতটুক বাস্তবায়ন হবে, সেটা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি হন, তার ওপরেই অনেকখানি নির্ভর করে। এখন এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়েছে বিএনপি
ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য তার অভিজ্ঞতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে বিএনপি। একাধিক সূত্র এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় ড. খলিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে মনে করছে বিএনপি। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও ড. খলিলের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মিদের সঙ্গেও ড. খলিলের যোগাযোগ রয়েছে। আন্তর্তজাতিক অঙ্গনেও ড. খলিলের যোগাযোগ ব্যাপক। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বাছাই করেছে।
বিএনপির যে অভিযোগ ছিলো
প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকাকালে ড. খলিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছিলেন, খলিলুর রহমান একজন বিদেশি নাগরিক। সে কারণে তাকে উপদেষ্টা পরিষদের পদ থেকে পদত্যাগের দাবিও তোলেন তিনি। তবে বিএনপির ওই অভিযোগের জবাবও দিয়েছিলেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি সেই সময় গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই অভিযোগ প্রমাণের দায়ভার অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়। প্রয়োজনে এটা আদালতে প্রমাণ করতে হবে। তিনি আরো বলেছিলেন, আমি একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আমার পূর্ণাঙ্গ অধিকার ভোগ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার থেকে রাখাইনে মানবিক করিডর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ড. খলিলুর রহমান সেই সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।
লন্ডন বৈঠকের নৈপথ্য ড. খলিল!
অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে গত বছর ১৩ জুন এক আলোচিত বৈঠক হয়। সেই বৈঠক বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথও নির্ধারণ করে। লন্ডন বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার সফর সঙ্গী ছিলেন ড. খলিলুর রহমান। সেই সময়ে লন্ডনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মধ্যেও এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠকের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন ড. খলিলুর রহমান।
রাজনৈতিক দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত মন্ত্রিসভায় অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তিতে অনেক রাজনৈতিক দলও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে মন্ত্রিসভা থেকে তাকে বাদ দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, সাবেক উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিএনপি সরকারে যোগ দিলে তার অন্তর্বর্তী সরকারে থাকাকালীন ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। এটি প্রমাণ করবে, খলিলুর রহমান আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেছেন।
এখন কী বলছেন ড. খলিল?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের প্রথম দিনেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারে থাকতে বিএনপি আপনার পদত্যাগের দাবি তুলেছিল। সেই আপনিই এখন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হলেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেসে বলেন, আমি তো আর জোর করে যাইনি। একেকজনের একেকজন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা থাকতে পারে, আর সেটা পরিবর্তনও হয়। আসেন আমরা সবাই মিলে দেশের জন্য ভালো কিছু করি।
ড. খলিল আরো বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে, তিনি এই পদে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আজ থেকে ৪৬ বছর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেই আমি দায়িত্ব পালন সূচনা করেছিলাম। জীবনের এই প্রান্তে এসে আবার সেখানেই এলাম। এটা একটি গুরু দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ফরেন পলিসি ও এর অভিমুখ নিয়ে যথেষ্ঠ চিন্তা ভাবনা করেছি। কিছু কিছু কাজও করেছি। প্রধানমন্ত্রী একটি কথা বারে বারে বলেছেন, সেটা হলো- সবার আগে বাংলাদেশ। আমাদের ফরেন পলিসিই হবে বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমাদের স্বার্থ সম্পূর্ণ রক্ষা করে পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চালাবো।
ড. খলিলকে নিয়ে বিএনপি এখন কী বলছে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানকেই কেন নিয়োগ দেওয়া হলো, সে বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ড. খলিলকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ড. আসাদুজ্জামান খান রিপন বলেন, বিএনপি সরকারে কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন, তা ড. ইউনূস চাপিয়ে দিতে পারেন না। বিএনপি কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার পাঠিয়েছে, এমনও না। তবে ড. খলিল সক্ষম মানুষ। তিনি ড. ইউনূসের ক্যাবিনেটে ভালো ডেলিভারি করেছেন। আর শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি নিয়ে একটি ডিল করেছেন। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের জন্য যেটা ছিলো একটি ব্রেক থ্রু। আগে আমাদের এই তুলার জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করে থাকতে হতো। তবে এখন নির্ভর করতে হবে না। এসব বিবেচনা থেকে বিএনপি দেখেছে। যিনি ভালো নেগোশিয়েট করতে পারেন, ভালো বার্গেইন করতে পারেন, সেই জায়গা থেকে বিএনপি যে কাউকেই তো ক্যাবিনেটে নিতে পারে। আর অন্তর্বর্তী সরকার থেকে কেউ যে বিএনপির নির্বাচিত সরকারে যোগদান করতে পারবেন না, সেটাও আইনে বাধা নেই। এখন কেউ যদি মনে করে আমি শুধু অন্তর্বর্তী সরকারে সার্ভ করবো, আর কোনো সরকারে থাকবো না, যেমন কেউ কেউ (অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধি) শপথ নেওয়ার আগেই দেশ ছেড়ে গেছেন। এখন কোনো সরকার পারস্পরিক বোঝা পড়া করে যদি দেশের স্বার্থে কাউকে দায়িত্বে আনতে চান, আর তিনি যদি আসতে চান, এখানে কোনো বাধা দেখছি না।
কে এই খলিলুর রহমান?
ড. খলিলুর রহমানের বণার্ঢ্য ক্যারিয়ার রয়েছে। ড. খলিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।
১৯৮০-৮৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড. খলিলুর রহমান সিভিল সার্ভিসে তার কর্মজীবনের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনার প্রধান রচয়িতা ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মসূচি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। ড. খলিলুর রহমান ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। এছাড়া তিনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ড. খলিলুর রহমান রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হাইরিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরে তাকে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদেও নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবেও যুক্ত হন তিনি।