গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের আঁচ লেগেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের থাকা না থাকা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা-গুঞ্জন। এরই মধ্যে দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য। বাকিরা আছেন মেয়াদ শেষ করার আশায়। তবে নিয়োগপত্রে থাকা ‘প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি যে কোনো সময় বাতিল করতে পারবেন’—বিশেষ এই শর্ত এখন অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। শেষ পর্যন্ত সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে জামায়াতপন্থি হিসেবে পরিচিত উপাচার্যরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ৪৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা একে একে পদত্যাগ করেন। মেয়াদ শেষ এবং কার্যক্রম শুরু হওয়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তর্বর্তী সরকার ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি ৫২টিতে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নিয়োগপত্রে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর প্রয়োজনে যে কোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন, একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে। এ বাক্যটি অনেক উপাচার্যের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সরকার চাইলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে এসব উপাচার্যকে অপসারণ করতে পারবে।
নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘আমরা রিভার্স গিয়ারে গাড়ি চালাতে চাই না। পেছনের দিকে নয়, আমরা সামনের দিকে তাকাতে চাই। অতীত নিয়ে পড়ে না থেকে আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলব।’
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার এই মুহূর্তে ঢালাওভাবে উপাচার্যদের সরাতে আগ্রহী নয়। কারণ, বর্তমান উপাচার্যের বড় অংশই বিএনপি ঘরানার। তবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াত ঘরানার উপাচার্য রয়েছেন, তারা নিজ থেকে সরে গেলে স্বাগত জানাবে সরকার।
এদিকে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান নির্বাচনের দুদিন আগেই গত ১০ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে সরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান। এরপর গতকাল রোববার তিনি উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। দুপুরে ঢাবির জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নিয়াজ আহমদ খান সকালে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নিয়াজ আহমদ খান ঢাবির উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে তার মূল পদে (উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের গ্রেড-১ অধ্যাপক) ফেরার জন্য রাষ্ট্রপতি বরাবর আবেদনপত্র জমা দেন।
অন্যদিকে, বিএনপিপন্থি হিসেবে পরিচিত উপাচার্যরা দায়িত্বে থাকার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাবি উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম, জাবি উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক এ এম সরওয়ার উদ্দিন। অবশ্য জাবি উপাচার্য বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য পদে থাকা নিয়ে নির্বাচনের আগে বিতর্ক ওঠে। আর শাবিপ্রবির উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য সিলেটে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় দেখা যাওয়ায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। তবে সব ছাপিয়ে তারা এখন উপাচার্য হিসেবে থাকতে আগ্রহী।
জামায়াত ঘরানার হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) উপাচার্য মুহাম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। গত বুধবার এসব অভিযোগ তুলে উপাচার্যের অপসারণ চেয়েছেন তারা। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘দায়িত্বে থাকাকালীন আমার জানামতে কোনো অন্যায় করেনি। রাষ্ট্রপতি যদি সরিয়ে দেন মোস্ট ওয়েলকাম জানিয়ে পরবর্তী ভিসিকে ফুলের মালা দিয়ে সরে যাব।’
উপাচার্য নিয়োগে গঠিত সার্চ কমিটির ভবিষ্যৎ কী: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করে। পদাধিকার বলে শিক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন এর আহ্বায়ক। কমিটি যোগ্য প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত পর্যালোচনা করে প্রতিটি পদের জন্য তিনজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। বর্তমান সরকার এ সার্চ কমিটি বহাল রাখবে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
ঢাবির নতুন উপাচার্য পদে আলোচনায় ৫ জন: উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান গতকাল রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার আগে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী তাকে ফুল দিয়ে ‘বিদায়ী’ শুভেচ্ছাও জানান। নিয়াজ খানের এই পদত্যাগপত্র জমাদানের ফলে শূন্য হতে চলছে ঢাবির শীর্ষ এ পদটি। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলেই নতুন আরেকজনকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে আলোচনা-গুঞ্জন শুরু হয়েছে ক্যাম্পাসে। এই পদে এগিয়ে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। চলতি সপ্তাহের যে কোনো সময় রাষ্ট্রপতি নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
উপাচার্য পদে এগিয়ে আছেন বর্তমান উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের আহ্বায়ক হিসেবেও নেতৃত্ব দেন। এরপর আলোচনায় রয়েছে নির্যাতিত শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান খান। তিনি বিএনপিপন্থি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) বর্তমান মহাসচিব। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির গণশিক্ষা সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের সদস্য। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নামে কলাম লেখায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে চাকরিচ্যুত করে। এরপর তার ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চলে।
উপাচার্য হওয়ার দৌড়ে আরও আছেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ইউট্যাবের বর্তমান সভাপতি। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানও এই পদে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
যেভাবে নিয়োগ-অপসারিত হন উপাচার্যরা: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণ দুটোই হয় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী। সেই আইনেই উপাচার্য নিয়োগ, দায়িত্বকাল ও অপসারণের বিধান নির্ধারিত রয়েছে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উল্লেখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ দেন। সাধারণত এই নিয়োগ চার বছরের জন্য হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের আগে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে অধ্যাপক পদমর্যাদা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সুনাম থাকা আবশ্যক রাখা হয়। উপাচার্যকে অপসারণের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় আইনে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সাধারণত উপাচার্যের দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ, আর্থিক অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আচার্য বা রাষ্ট্রপতি তাকে অপসারণ করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন আচার্য। কিছু আইনে জনস্বার্থে বা প্রশাসনিক কারণে অপসারণ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও ছিল উপাচার্যের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, দুর্নীতির অভিযোগ: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার উপাচার্য নিয়োগে যোগ্য ও অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিলেও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইআবি) প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের কয়েকটি পদের নিয়োগ পরীক্ষার চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠার পর সেই নিয়োগ স্থগিত করেন তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার। ইউজিসি অভিযোগটি তদন্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেন, সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রুহুল্লাহ, সহকারী রেজিস্ট্রার দিদার উল্লাহ ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আব্দুল হান্নান সাব্বিবের কাছে জিম্মি ছিল।
এ বিষয়ে ইআবির উপাচার্য অধ্যাপক শামছুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে রেজিস্ট্রারকে নিয়োগ বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশনায় তদন্ত হচ্ছে।’ রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেন কালবেলাকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থীর কাছে অর্থ দাবি করার অডিও রেকর্ড ফাঁস এবং মেধার ভিত্তিতে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও যোগ্য প্রার্থীকে ভাইভায় না ডাকার ঘটনা ঘটেছে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে উপাচার্যের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো সার্কুলার বা পূর্ব অনুমোদন ছাড়াই অ্যাডহক ভিত্তিতে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অকৃতকার্য দেখানো ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ শূন্য হওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবিষ্যতের জন্য নিয়োগ প্যানেল তৈরি করে রাখা হয়।