Image description
১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন, নির্বাচিত হবে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্য বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা হয়েছে ১৩৩টি অধ্যাদেশ। এর মধ্যে পূর্ববর্তী বিভিন্ন আইনে সংশোধনী এনে জারি করা হয় ৯২টি। সম্পূর্ণ নতুনভাবে জারি করা হয়েছে ৩৮টি অধ্যাদেশ। আর পূর্ববর্তী আইন রহিত করে জারি করা হয় তিনটি। এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর। এই অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ শুরু হতে পারে বলে গতকাল রোববার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংসদ যেসব অধ্যাদেশের অনুমোদন দেবে, সেগুলো আইন হিসেবে কার্যকর থাকবে। অনুমোদন না দিলে সেই অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাবে।

প্রথম অধিবেশনের বিষয়ে গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন শুরু হতে পারে। সেই অধিবেশনে কী কী কর্মসূচি থাকবে, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যেমন অধিবেশনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে, সেগুলো উপস্থাপন করা হবে এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রদান। এ ছাড়া সংসদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অধিবেশন আহ্বানের প্রজ্ঞাপন ১৫ দিন আগে করতে হবে। সামারিটা জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই সংসদ অধিবেশন আহ্বান করবেন রাষ্ট্রপতি।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের। সেদিন পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ৬ আগস্ট সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ৮ আগস্ট শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় অন্তর্বর্তী সরকারের। একই বছরের ১৩ আগস্ট প্রথম অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সে বছর ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

এর মধ্যে দুটি ‘রহিতকরণ’ এবং দুটি ‘পূর্ণাঙ্গ’ অধ্যাদেশ। বাকি ১৩টি ‘সংশোধন’ অধ্যাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর সবচেয়ে বেশি ৮০টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর মধ্যে ২২টি ‘পূর্ণাঙ্গ’ অধ্যাদেশ। বাকি ৫৮টি সংশোধন অধ্যাদেশ। আর চলতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে একটি রহিতকরণ অধ্যাদেশ, ১৪টি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাদেশ। বাকি ২১টি সংশোধন অধ্যাদেশ। এই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে প্রথম অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর। পরে আইনটিতে আরও তিন দফা সংশোধনী আনা হয়।

এ ছাড়া আছে গণভোট অধ্যাদেশ, যেটি গত বছর ২৫ নভেম্বর জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি জারি করা হয় গত বছর ৩০ নভেম্বর। এরপর ১ ডিসেম্বর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ৯ ডিসেম্বর পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। আর চলতি বছর জারি করা ৩৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশগুলো হচ্ছে, বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা (সংশোধন) অধ্যাদেশ। এ ছাড়া রয়েছে সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সের সীমা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের মতো অধ্যাদেশও। জানতে চাওয়া হলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

সংসদ কার্যকর না থাকলে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে থাকেন। অনুচ্ছেদ ৯৩(১) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ ভাঙিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।’ তবে এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা শর্তসাপেক্ষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না, সে রকম তিনটি শর্ত দেওয়া আছে এই অনুচ্ছেদে।

এসব শর্তে বলা আছে, ‘সংসদ যে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না, অধ্যাদেশ দিয়ে সেই ধরনের কোনো আইন করা যাবে না। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে না এবং আগে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না।’ আবার ৯৩(৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারি করা প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ৩০ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলি প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।’

সংবিধানের এই বিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী তা করেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশ হয় পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে ১৪ মার্চের মধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১২ মার্চ অধিবেশন আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ওই দিনই অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অধ্যাদেশই সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘আশু ব্যবস্থা গ্রহণ’ বা ‘প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান’—এই শর্ত পূরণ করে প্রণয়ন করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো জরুরি অবস্থা বা প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এই অধ্যাদেশগুলো জারি করা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বাইরে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এগুলো করানো হয়েছে। আমি মনে করি, বেশকিছু অধ্যাদেশ করার ক্ষেত্রে সংবিধানের বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে।’

এই আইনজীবী বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার যদি এসব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে সংসদে পাস করে, তবে তা সাংবিধানিকভাবে বৈধ হয়ে যাবে। তবে সংসদে আইন হিসেবে পাস হওয়ার পরও যদি সংশ্লিষ্ট আইনের কোনো ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তখন সেই ধারাটি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যাবে।’

এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিভিন্ন খাতে পরিবর্তন আনতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১২২টি অধ্যাদেশকেই একসঙ্গে আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। এরপর অধ্যাদেশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে। পরে সেগুলোকে প্রক্রিয়া অনুযায়ী আইনে রূপান্তর করা হয়। অন্য অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় সংসদ অধিবেশন শুরুর ৩০ দিন পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।

নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি এরই মধ্যে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদ নেতা নির্বাচন করেছে। তার নেতৃত্বে নতুন সরকার এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। তবে বিএনপি এখনো স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সংসদ উপনেতা ও চিফ হুইপ পদে কাকে মনোনীত করবে, তা প্রকাশ করেনি। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনই এগুলো নির্বাচন করা হবে বলে জানা গেছে।