রাজধানী ঢাকায় গত এক বছরে আলোচিত সব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ভাড়াটে খুনি । পুলিশের তথ্য অনুযায়ী , নির্দেশদাতারা নেপথ্যে থেকে টাকার বিনিময়ে ভাড়াটে শুটার দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে । এসব মামলার তদন্তে নেমে রাজধানীতে সক্রিয় ৪০১ জন ভাড়াটে শুটার বা খুনিকে শনাক্ত করেছে পুলিশ । তাদের তালিকাও করেছে পুলিশ ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ( ডিএমপি ) সূত্র বলছে , ডিএমপির আট অপরাধ বিভাগে শনাক্ত করা এই ৪০১ জন ভাড়াটে শুটারের মধ্যে ১১৮ জনই মতিঝিল বিভাগে । এরপরই রয়েছে ওয়ারী বিভাগে , ৭৩ জন । এই শুটারদের অধিকাংশের কারও বিরুদ্ধে হত্যাসহ সর্বোচ্চ ৪৩ টি এবং কারও বিরুদ্ধে ১০ টি মামলা রয়েছে । তারা কিছুদিন পরপর স্থান পরিবর্তন করে ।
ভাড়াটে খুনিদের কারণে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে । পুলিশের সূত্র জানায় , গত বছরের ২১ মার্চ গুলশানে ব্রডব্যান্ড ( ইন্টারনেট সংযোগ ) ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন হত্যায় ভাড়াটে খুনি ব্যবহার করা হয় । এরপর গত ১০ মাসে ভাড়াটে খুনি দিয়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে দোকানে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয় । এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী সাবিহা আক্তার দিনার পল্লবী থানায় করা মামলাটি ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ( ডিবি ) তদন্ত করছে । এ মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় , গ্রেপ্তার প্রধান আসামি জনি ভূঁইয়ার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী , বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুনের নির্দেশে কিবরিয়াকে হত্যা করা হয় ।
দুবাই থেকে দেশে আসা পাতা সোহেল ওরফে মনির হোসেনসহ কয়েকজন ভাড়াটে শুটার এই হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে । মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছে সোহাগ ওরফে কাল্লু , মাসুম ওরফে ভাগিনা মাসুম , মাসুম বিল্লাহ , নজরুল ইসলাম , জামাল সরদার ও রোকন । তদন্তকারীদের দাবি , তারা সবাই পেশাদার ভাড়াটে খুনি । ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল আজকের পত্রিকাকে বলেন , মামলাটির তদন্ত চলছে । আরও কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া হবে ।
ডিবি বলছে , গত এক বছরে রাজধানীতে আরও কয়েকটি টার্গেট কিলিং হয়েছে , যেগুলোর সঙ্গে ভাড়াটে খুনিদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে । এর মধ্যে ২৫ মে রাতে মধ্য বাড্ডায় গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক কামরুল আহসান সাধন , ৮ জানুয়ারি কারওয়ান বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির , ২১ মার্চ গুলশানে ব্রডব্যান্ড ব্যবসায়ী সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন , ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন এবং ১১ ডিসেম্বর শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আবদুর রহমান ভূঁইয়া হত্যা রয়েছে । সব ঘটনাতেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করেছে ভাড়াটে শুটাররা ।
ডিবি জানায় , তদন্তে উঠে এসেছে , সুমন মিয়া হত্যার নির্দেশদাতা বাড্ডা- গুলশান এলাকার সন্ত্রাসী মেহেদী । তাঁর নির্দেশে ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ , বিল্লাল ও মামুনের নেতৃত্বে চার - পাঁচজনের একটি দল গুলি চালায় । বিল্লাল ও মামুনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা রয়েছে । পুলিশের খাতায় তারা ভাড়াটে খুনি হিসেবে চিহ্নিত । পুলিশ বলছে , স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে হত্যার নির্দেশদাতা ‘ দীলিপ ওরফে বিনাশ ” নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী । এ ঘটনায় ডিবি পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে । তারা হলো আবদুর রহিম , জিন্নাত , আবদুল কাদের , রিয়াজ ও বিলাল ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন , মুছাব্বিরকে গুলি করে দুই শুটার রহিম ও জিন্নাত । তারা টাকার বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় ৷ পুলিশ জানায় , সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে নেমে ডিএমপি রাজধানীতে ভাড়াটে খুনিদের একটি তালিকা করেছে ।
এই তালিকা অনুযায়ী , ডিএমপির আটটি ক্রাইম বিভাগে শনাক্ত হয়েছে ৪০১ জন ভাড়াটে শুটার । তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ১০-৪০টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে । তাদের মধ্যে মতিঝিল বিভাগে ১১৮ জন , ওয়ারীতে ৭৩ জন , তেজগাঁওয়ে ৬১ জন , মিরপুরে ৬০ জন , রমনাতে ৩৬ জন , লালবাগে ২৪ জন , গুলশানে ১৬ জন এবং উত্তরায় ১৩ জন রয়েছে । ডিএমপির ৫০ থানার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাড়াটে খুনি রয়েছে মতিঝিল থানা এলাকায় , ১০৬ জন । এরপর বৃহত্তর মিরপুরে ৪২ জন , মোহাম্মদপুরে ৩৯ , কদমতলীতে ৩৪ , শ্যামপুরে ২১ ও নিউমার্কেট থানা এলাকায় ২০ জন রয়েছে । এই তালিকাভুক্তদের অপরাধের অতীত পর্যালোচনায় দেখা গেছে , তারা রাজধানীর নির্দিষ্ট এলাকায় থাকে না , অবস্থান পরিবর্তন করে ।
চুক্তি অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় । তাদেরই একজন ভাষানটেকের রূপচাঁদ মিয়া । তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা , অস্ত্র , হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন থানায় ৪৩ টি মামলা রয়েছে । একই এলাকার শুটার বাবুলের বিরুদ্ধে ৩৪ টি , রামপুরার ভাগিনা তুষারের বিরুদ্ধে ২২ টি , তেজগাঁওয়ের মন্টু জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ২০ টি এবং ভাষানটেকের বুকপোড়া সুজনের বিরুদ্ধে ১৯ টি মামলা রয়েছে । রাজধানীতে ‘ টার্গেট কিলিংয়ের ’ ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ( মাভাবিপ্রবি ) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড . মোহাম্মদ উমর ফারুক বলেন , ভাড়াটে খুনিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে না দিলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা কঠিন হবে । ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ( ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস ) এস এন মো . নজরুল ইসলাম বলেন , অপরাধীদের শনাক্ত করা হয়েছে , তাদের গ্রেপ্তারে কাজ চলছে । ইতিমধ্যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ রকম কয়েকজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।