বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এবার ইতিহাস গড়া নতুন যুগল নেতৃত্ব দেখা গেছে। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দা দীপেন দেওয়ান এবং প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ হয়েছেন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এ দুজনের মধ্যে একজন অবাঙালি অন্যজন বাঙালি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পার্বত্য-সমতল দুই অঞ্চলের সমন্বয়কে পাহাড়ে শান্তি ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীপেন দেওয়ান রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি চাকমা জাতিসত্তার প্রতিনিধি। আর প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি অপাহাড়ি হলেও কেন্দ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রথম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন কল্পরঞ্জন চাকমা। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ২০০১ সালে মনি স্বপন দেওয়ান উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মন্ত্রণালয়টিতে এ পর্যন্ত ১৬ জন দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বাঙালি ও অবাঙালি একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একসঙ্গে পাহাড়ি-অপাহাড়ি প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় শুধু প্রশাসনিক নয়, সচেতন অংশীদারিত্বের মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, যুগল নেতৃত্ব স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় স্তরে সমন্বয় বাড়ায়, সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় গভীরতা আনে এবং স্থানীয়দের মধ্যে ভালোবাসা ও আস্থা তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, সমন্বয় ও আস্থা বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে বেলজিয়াম, কানাডা ও নেপালকে উল্লেখ করা যেতে পারে। বেলজিয়ামে ফ্ল্যান্ডার্স ও ওয়ালোনিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দুটি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে যুগল মন্ত্রী ও সমন্বয় কমিটি ব্যবহার করা হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেছে।
কানাডার কুইবেক প্রদেশে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষাভাষী প্রতিনিধিদের যুগল নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়। এতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও জাতীয় নীতির মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পায়। নেপালে পাহাড়ি, ত্রিবেণী ও মধেসি সম্প্রদায়ের যৌথ মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দুই বা তিন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকলে স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর যুগল নেতৃত্বও একই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, আমি অবাঙালি হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় গর্বিত। এটি একটি নতুন দিগন্তের সূচনা, যেখানে কেন্দ্র ও পাহাড়ের মধ্যে সমন্বয় আরো শক্তিশালী হবে। মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের চাহিদা ও স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব।
তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত করব, পাহাড়ি ও সমতল—দুই অঞ্চলের মানুষ যেন সমানভাবে উন্নয়নের সুফল পায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুগল নেতৃত্ব কার্যকর উদ্যোগ নেবে। এছাড়া স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা নয় বরং পার্বত্য অঞ্চলে আস্থা, ভালোবাসা ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরি করা। স্থানীয় মানুষ যেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে নিজের ভূমিকা দেখতে পায় এবং নিজেকে অংশীদার মনে করে, সেটিই আমাদের প্রকৃত সাফল্য হবে। এই যুগল নেতৃত্ব পার্বত্য শান্তি ও স্থিতিশীলতার নতুন বার্তা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শান্তি, সমন্বয় ও সমৃদ্ধির পথ সুগম করবে।