নানা জল্পনা-কল্পনার ভেতর দিয়েই ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভূমিধস বিজয়ের মধ্যে দিয়ে নতুন সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর দেশে ফিরেই প্রথমবারের মতো শুধু সংসদ সদস্যই না, একেবারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
একইসঙ্গে বিদায় নিলো ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলানিউজ: রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমানে একটা বিরাট সংকট। এখন যে পরিমাণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করছে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের ফেরত দেওয়াটা আসলে কতটুকু সম্ভব?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: আমি যদি প্র্যাকটিক্যালি চিন্তা করি, সম্ভাবনা খুবই কম। ব্যাপারটা শুধু বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে ইন্টারন্যাশনাল প্লেয়ার এত বেশি সম্পৃক্ত হয়ে গেছে, এই পুরো ক্রাইসিসটাতে... শুধু রোহিঙ্গা না, মানে এই টোটাল আরাকান বা রাখাইন স্টেটের এই পুরো ব্যাপারটা নিয়ে।
বাংলানিউজ: কিন্তু এই যে দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখানে আছে, এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ কি না?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: এখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কথা যদি বলেন, তাহলে মূলত সমস্যাটা ওই নির্দিষ্ট এলাকাকে ঘিরেই।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে। র্যাবকে নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা আছে, সেটি আমি জানি। আগে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ র্যাব-৭-এর আওতায় ছিল। পরে একমাত্র কক্সবাজারের জন্য আলাদাভাবে র্যাব-১৫ নামে একটি নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়েছে, বিশেষভাবে ওই এলাকাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। আমাদের প্রস্তুতি সবসময়ই থাকে। তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমরা কি চাই যে বিষয়টি সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক, নাকি আমরা চাই সমস্যাটি জিইয়ে রাখতে? কারণ অনেক আন্তর্জাতিক পক্ষ আছে, যারা তাদের স্বার্থে এই সমস্যাটিকে যতদিন সম্ভব দীর্ঘায়িত করে রাখতে চায়।
বাংলানিউজ: এখন ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। আর কয়েক দিন পরই ২৫ তারিখ—পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ১৭ বছর পূর্ণ হবে। গত বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তদন্ত কমিশনের একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কিছু নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। যেমন দলগতভাবে আওয়ামী লীগকে এখানে জড়িত বলা হয়েছে; প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে ফজলে নূর তাপসের নাম এসেছে; এমনকি শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে; ভারতের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে আসলে আরও কোনো বড় হাত ছিল কি না, বা প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড কে ছিল—এটা কি আমরা কখনো জানতে পারব? কিংবা এই বিচারগুলো কি আমরা কখনো দেখতে পারব? এতগুলো সেনা কর্মকর্তা—আমাদের চৌকস ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে—এই বিচারটা কি তাদের পরিবার দেখতে পারবে, কিংবা আমরাই কি দেখতে পারব?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: এখন বিচার করতে হলে, যাদের বিচার করবেন, তাদের তো উপস্থিত থাকতে হবে। আমরা অনুপস্থিত অবস্থায় (in absentia) বিচার করতে পারি। কিন্তু সেই অনুপস্থিতিতে বিচার হলে, তা আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর সদস্যদের কতটুকু সন্তুষ্ট করবে—এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যাদের বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল, আমার মনে হয় না তাদের কেউ এখন দেশে আছে। তাদের দেশে ফেরত আনার প্রসঙ্গ উঠলে আবার ঘুরেফিরে ভারতের কথাই চলে আসবে।
কয়েক দিন আগে, নির্বাচনের প্রায় সপ্তাহখানেক আগে, বিএনপির পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বড় সেমিনার করা হয়েছিল। সেখানে পিলখানার শহীদ পরিবারের অনেক সদস্যকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমি নিশ্চিত, তাদের এ ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। এখন বিষয়টি তাদের ওপরই নির্ভর করছে—এটা কি শুধু নির্বাচনী অবস্থান ছিল, নাকি তারা সত্যিই এ বিষয়ে সদিচ্ছা পোষণ করে। সেটা তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সীমিত সময়ের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, হয়তো তা করেছে। তারা একটি পুনঃতদন্ত কমিশন গঠন করেছে। আগের সরকারের যে ফরমায়েশি রিপোর্ট ছিল, সেখান থেকে পৃথকভাবে নতুন করে তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এখন সেই প্রতিবেদনের বাস্তবায়ন যেহেতু নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব, তাই তাদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের কার্যক্রম দেখার আগে আমি আগ বাড়িয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না, কারণ সেটা তাদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত হবে না। আমি আশাবাদ নিয়েই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করব। যদি আশাপ্রদ কিছু না দেখি, তখন হয়তো এ বিষয়ে আবার কথা বলতে হবে।
বাংলানিউজ: ওই যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা বললেন—সদিচ্ছা থাকলে এটি খুব কঠিন কাজ নয়।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: এক্সাক্টলি।
বাংলানিউজ: আমি যতটুকু জানি, ২০১৯ সালে জেনারেল আজিজ আর্মি চিফ থাকার সময় আপনার স্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে আপনাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। শুধু একজনের স্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কাউকে চাকরি ছাড়তে হয়—অথচ এর চেয়ে অনেক বড় অনৈতিক কাজ সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা করেছেন, এবং হয়তো এখনো পর্যন্ত টিকে আছেন।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: আছেন, এরকম অনেককেই আমি চিনি।
বাংলানিউজ: এ দুই বিষয় নিয়ে আপনার কাছ থেকে একটু জানতে চাই।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: এখানে শুধু আমি একা নই, এরকম অনেকেই ভুক্তভোগী ছিলেন। ঘটনাটা ছিল এমন যে, সেনাবাহিনীতে অনেক বছর ধরেই এটি নিয়মের মধ্যেই ছিল, নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ কিছু করেননি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বিষয়টি করা হতো। সম্ভবত ২০১০ সালের দিকে, যখন জেনারেল মঈন আমাদের সেনাপ্রধান ছিলেন, তখন তিনি একটি নিয়ম প্রণয়ন করেন যে, সেনাবাহিনীতে কেউ যদি নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য চাকরিরত অবস্থায় অন্য কোনো দেশে বৈদেশিক অভিবাসন নিতে চান, তাহলে নিতে পারবেন। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়—এই ফরম্যাট অনুযায়ী আবেদন করতে হবে, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স হবে, যে দেশে অভিবাসন নিতে চান সেই দেশের সঙ্গে আমাদের কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে কি না বা কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না—এসব বিবেচনা করেই অনুমতি দেওয়া হতো। অনুমতি পাওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় তারা অভিবাসন নিয়েছেন এবং চাকরিরত অবস্থাতেই ছিলেন। কখনো কোনো সমস্যা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এভাবেই চলছিল।
২০১২ সালে আমি যখন বিয়ে করি, তখন আমার ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বিষয় ছিল না। আমার স্ত্রী বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকেই পরিবারসহ বৈধ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে এমন হাজার হাজার পরিবার আছে, এতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি বাংলাদেশেও থাকতেন এবং এখানে লেখাপড়াও করতেন। ২০১২ সালে আমি যখন বিয়ে করি, তখন সেনাবাহিনীতে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না; বরং চাকরিরত অবস্থায় কোনো অফিসার চাইলে অভিবাসনও নিতে পারতেন। সুতরাং আলাদাভাবে কোনো ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। কারণ আমি যাকে বিয়ে করেছি, তিনি মূলত একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যার ঘটনাক্রমে আরেকটি দেশে দ্বিতীয় একটি স্ট্যাটাস ছিল। তখনকার আইনে এটি নিয়মবহির্ভূত কিছু ছিল না।
তারপরও আমি সেনাবাহিনীর যেসব জায়গায় নোটিফাই করা প্রয়োজন ছিল, সব জায়গায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। সব জায়গা থেকে অনুমতি নিয়েই বিয়ে করেছি। বিয়ের পর আমার স্ত্রী যাতায়াত করতেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তার পরিবারের সঙ্গে থাকতেন এবং মাস্টার্স করছিলেন। মাঝখানের তিন-চার বছর দেখা গেছে, একেকটি সেমিস্টারে দীর্ঘ সময়ের জন্য তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। কোনো সমস্যা ছিল না, সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
এরপর আমি প্রায় এক বছরের জন্য জাতিসংঘ মিশনে কঙ্গোতে ছিলাম। সে সময় আমি দেশে ছিলাম না, স্বাভাবিকভাবেই তিনিও দেশে ছিলেন না; তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স করছিলেন। পরে সব শেষ করে তিনি দেশে চলে আসেন। এর মধ্যে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব হয়ে যায়। আমাদের দুটি সন্তান হয়, তাদের নিয়ে তিনি দেশে চলে আসেন। সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল।
২০১৮ সালের মধ্যে আমাদের তিনজন সেনাপ্রধান পরিবর্তিত হয়েছেন। ২০১৮ সালে জেনারেল আজিজ দায়িত্ব নেওয়ার পর হঠাৎ করে এই নীতিমালা পরিবর্তন করেন। প্রথমে তিনি বলেন, এখন থেকে কেউ চাকরিরত অবস্থায় অভিবাসন নিতে চাইলে নিতে পারবেন; তবে ভিসা পাওয়ার পরই তাকে স্বেচ্ছায় অবসরের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। কিন্তু যারা এর আগে অভিবাসন নিয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে বলা হলো—হয় চাকরি ছাড়তে হবে, নয়তো অভিবাসন ত্যাগ করতে হবে। অথচ কোনো নতুন আইন আগের ঘটনাকে প্রযোজ্য করা যায় না—পৃথিবীর কোথাও এভাবে হয় না। কিন্তু সেটাই করা হলো।
আমার নিজের ক্ষেত্রে তো আমি কখনো কোনো অভিবাসনের জন্য আবেদনই করিনি। আমার স্ত্রী ও সন্তানরা দ্বৈত নাগরিক। আমাকে বলা হলো—হয় চাকরি ছাড়তে হবে, নয়তো স্ত্রীকে তার আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে। সন্তানদের ক্ষেত্রে তো তা সম্ভব নয়; তারা ১৮ বছর পূর্ণ না হলে কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারবে না।
আমি যখন একজন মানুষকে বিয়ে করেছি, তখন তাকে বলেছি—আইনগতভাবে কোনো সমস্যা নেই। সেই আশ্বাস দিয়েই বিয়ে করেছি। এখন বিয়ের ছয় বছর পর যদি বলি, তোমাকে তোমার নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে হবে, এটা তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আমার নিজের এবং আমার ইউনিফর্মের অপমান। একজন ইউনিফর্ম পরা মানুষ হিসেবে আমি আমার কথার প্রতি অটল থাকার প্রত্যাশা করি। আমি আমার কথা থেকে সরে আসতে পারি না।
এদিকে জেনারেল আজিজ যে নতুন নীতিমালা করেন, সেখানে একটি ধারা ছিল—এখন থেকে কোনো অফিসার যদি এমন কাউকে বিয়ে করতে চান, যার অন্য কোনো দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব বা অভিবাসন আছে, তাহলে বিয়ে করতে পারবেন, তবে কিছু শর্ত মানতে হবে। এক. সেনাপ্রধানের অনুমতি নিয়ে বিয়ে করতে হবে। দুই. চাকরিরত অবস্থায় তার স্ত্রী বা স্বামী অভিবাসনের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। তিন. বিয়ের পর ওই অফিসারের স্ত্রী বা স্বামীকে দেশেই অফিসারের সঙ্গে বসবাস করতে হবে। আমি তখন পর্যন্ত এই তিনটি শর্তই পূরণ করছিলাম।
বাংলানিউজ: এই তিনটি শর্ত পূরণ করার পরেও, বা আপনার মতো নিশ্চয়ই আরও অনেকে ছিলেন, তাহলে কেন আপনাকে চাকরি ছাড়তে হলো?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: তখন যা হলো, আমার তৎকালীন যিনি বস ছিলেন, তিনি বললেন—তুমি তো এই শর্তগুলোর সবই পূরণ করেছ। আর তোমার বিয়ে হয়েছে ছয় বছর আগে, তখন তো এই আইন ছিল না। সুতরাং আগে থেকে চিফের অনুমতি নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতাও তোমার ছিল না। তখন পর্যন্ত তিনি খুবই ইতিবাচক ছিলেন। তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে নতুন পলিসিটি নিশ্চয়ই ইতিবাচক উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। তিনি বললেন, তাহলে আমরা একটি আবেদন করি, যেহেতু তুমি সব শর্ত পূরণ করছ, তোমাকে পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদন দেওয়া হোক। অর্থাৎ চিফের যে অনুমতি আগে নেওয়ার কথা ছিল, তখন যেহেতু পলিসি ছিল না, সেটির একটি পরবর্তী অনুমোদন দেওয়া হোক।
আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিলাম। সব রেফারেন্স উল্লেখ করে আবেদন পাঠালাম। কিন্তু জেনারেল আজিজ আহমেদ সেই আবেদন অনুমোদন তো দিলেনই না, বরং কী করলেন... ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি—এই পাঁচ মাসের মধ্যে তিনি নিজের করা পলিসিটাই আবার পরিবর্তন করলেন। সেপ্টেম্বরের পলিসি বাতিল করে নতুন আরেকটি পলিসি জারি করলেন, যেখানে ওই ক্লজটাই বাদ দেওয়া হলো। অর্থাৎ তিনি দেখলেন, তার বানানো পলিসির মধ্যেই আমরা নিজেদের অ্যাকোমোডেট (সমন্বয়) করে ফেলছিলাম। তখন তিনি সেই ক্লজগুলো বাতিল করে নতুন পলিসি দিলেন।
নতুন পলিসিতে আরও কিছু শর্ত যুক্ত করা হলো। এমনকি আমি যদি আমার স্ত্রীর আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগও করতাম, তাহলেও আমাকে এবং আমার পরিবারের সবার পাসপোর্ট আর্মি হেডকোয়ার্টারে জমা দিতে হতো, যেন আমি কোনো অপরাধী! সাধারণত অপরাধীদের ক্ষেত্রেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে তারা দেশত্যাগ করতে না পারে। আমাকে এরকমও বলা হলো যে, এ ধরনের কোনো অফিসার যদি নাগরিকত্ব ত্যাগও করেন, তাহলে তাকে কোনো ভালো বা স্পর্শকাতর স্থানে পোস্টিং দেওয়া হবে না। অর্থাৎ চাকরি চালিয়ে যেতে হলে আমাকে মাথা নিচু করে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো থাকতে হবে।
বাংলানিউজ: এটা তো শাস্তির মতো।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: একদম তাই। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই অপমানজনক শর্ত মেনে থাকার চেয়ে আমি সসম্মানে বের হয়ে যাই।
বাংলানিউজ: আপনার সঙ্গে কতজনকে এমনভাবে চাকরি ছাড়তে হয়েছে?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: এখানেও জেনারেল আজিজ আহমেদ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। একসঙ্গে করলে এটি বড় ধরনের খবর হয়ে যেত। তিনি ছোট ছোট ব্যাচে বিষয়টি করেছেন। সংখ্যাটি সম্ভবত ১৭০ থেকে ২২০-২৩০ এর মাঝামাঝি।
বাংলানিউজ: আমরা রাজনৈতিক অনেক পদোন্নতির কথা শুনি, রাজনৈতিক কারণে চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে। ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত? এটাও কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় হবে?
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: অবশ্যই, এটার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। আপনি কি চান আপনার একটি প্রফেশনাল আর্মি থাকুক? যদি না চান, অর্থাৎ আপনার প্রফেশনাল আর্মির প্রয়োজন নেই, আপনার প্রয়োজন এমন ‘ইয়েস ম্যান’ তোষামোদী আর্মি, যেমন ছিল হাসিনার সময়, তাহলে উত্তর পুরোপুরি আলাদা হবে। কিন্তু আপনি চাইলে, আপনার একটি প্রফেশনাল আর্মি থাকবে, যারা সম্পূর্ণভাবে তাদের ক্ল্যাসিক্যাল ধারার অনুসারে কাজ করবে, নিজেদেরও সেই অনুযায়ী প্রস্তুত রাখবে। তখন এটি সম্ভব।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা গত ১৮ মাসে সংস্কারের অনেক কথা বলেছি এবং অনেক জায়গায় সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়েছে—অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশে হয়েছে, কিন্তু মিলিটারিতে এরকম কোনো রিফর্মের কথা শোনা যায়নি। এটা দুঃখজনক। এটা হওয়া প্রয়োজন ছিল এবং অবশ্যই বেশি গুরুত্বের সাথে হওয়া দরকার ছিল। যারা ‘রটেন অ্যাপল’, তাদের আমরা চিনি, নাম ধরে চিনি। যারা আমাদের আর্মিকে পলিটিসাইজ করেছেন, যারা মুজিব কোর্ট পরে স্টেজে উঠে গিয়েছেন, কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নিয়েছেন বা কোনো কালচারাল প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন, তাদের চিনি।
বাংলানিউজ: আমরা একজন আর্মি অফিসারকে শেখ হাসিনার পা ধরে সালাম করতে দেখেছি।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: ওনাকে তো ‘কদমবুসি জেনারেল’ বলা হয়। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হলেও তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আর্মি অফিসার। এখনও এমন কিছু আর্মি অফিসার আছে। সংখ্যা খুব বেশি নয়। এখন নতুন সরকার এসেছে, তারা কী ব্যবস্থা নেবে, তা জানা নেই। প্রথম কাজ হচ্ছে এই ক্লেঞ্জিং করা এবং এরপরের ধাপ হলো নতুন ক্ষমতায় আসা বিএনপি যদি মনে করে আমাদেরও এমন তোষামোদী লোক দরকার, তাহলে কোনো লাভ নেই। একবার ক্লেঞ্জিং হবে, আর সেখানে অন্য দল বসে যাবে।
এ কাজটা সহজ যদি কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকে। আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্সের সব আইনকানুন আছে,‘ম্যানুয়াল অব মিলিটারি ল’—এত মোটা বই। যদি কেউ এটিকে ঠিকমতো ফলো করে, তাহলে অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। সবকিছু এত স্ট্রাকচারড—একজন অফিসারের বা সৈনিকের ট্রেনিং কখন হচ্ছে, প্রমোশন কখন, প্রমোশনের ক্রাইটেরিয়া কী, কী কোয়ালিফিকেশন অর্জন করতে হবে—প্রত্যেকটি বিষয়ই স্ট্রাকচারড। এটি কোনো রকেট সায়েন্স নয়। আপনি শুধু স্ট্রাকচারটি ফলো করুন, বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া, তখনই সম্ভব।
এত বছর ধরে যা ছিল—প্রমোশন হবে, ওই প্রমোশন বোর্ডের আগে ডিজিএফআই থেকে দুইটি তালিকা আসত। তালিকা ‘এ’—এদের প্রমোশন দিতে হবে; তালিকা ‘বি’—এদের প্রমোশন দেওয়া যাবে না। যদি এ ধরনের সিস্টেম চালু থাকে, তাহলে কোনো লাভ নেই। এই সিস্টেম বন্ধ করতে হবে।
বাংলানিউজ: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মেজর (অব.) শাফায়াত আহমদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।