Image description

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতারোহনের পর থেকেই সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ও বর্তমানে মন্ত্রীপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আমলা নাসিমুল গনিকে বাংলাদেশে হিজবুত তাহরিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি বেশ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও তাকে হিজবুত তাহরিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রচার করেছে।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত সিএ ফ্যাক্টচেক উইং গত বছরের ৫ জানুয়ারি প্রমাণসহ উপস্থাপন করেছে যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি ও হিজবুত তাহরিরের প্রতিষ্ঠাতা নাসিমুল গনি একই ব্যক্তি নয়।

তবে সে গুজবটি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনায় এনেছেন বিতর্কিত সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।

আজ সোমবার মন্ত্রীপরিষদ হিসেবে নাসিমুল গনিকে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন শেয়ার করে সায়ের তার এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “প্রথমে দেখে ভেবেছিলাম এটা হয়তো অসত্য প্রচারনা, কিন্তু বিভিন্ন স্তরে যাচাই করে দেখলাম বাস্তবিকভাবেই এই কাজটি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের সাথে এই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা অনেকেই অবগত, সুইসাইডাল এই সিদ্ধান্তটা কে নিয়েছেন?

This is a total disaster to begin with!” 

বাংলাদেশের হিজবুত তাহরিরের প্রতিষ্ঠাতা নাসিমুল গনি ও বর্তমান মন্ত্রী পরিষদ সচিব হিসেবে নিয়াগ পাওয়া নাসিমুল গনি যে আলাদা তার অনেক প্রমান মিলে হিজবুত তাহরিরকে নিয়ে ২০০১ থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

যেমন ২০০৫ সালের ৮ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিজবুত তাহরির প্রতিষ্ঠা ও নাসিমুল গনির ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়, গোলাম মাওলা নামে ঢাবির ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একজন লেকচারার ১৯৯৩ সালে পিএইচডি করার জন্য লন্ডনে গেলে সেখানে তার সাথে নাসিমুল গনি ও কাউসার শাহনেওয়াজ নামের দুই ব্যক্তির সাথে পরিচয় ঘটে। তারা লন্ডনের রিজেন্ট পার্কে একটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালের দিকে নাসিমুল ও শাহনেওয়াজ বাংলাদেশে ফিরে ধানমন্ডীর ৬/এ -তে একটা বিবিএ কোচিং সেন্টারে হিজবুত তাহরের কার্যালয় খুলেন।

 উক্ত প্রতিবেদনে নাসিমুল গনিকে একজন চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে হিজবুত তাহরিরের তৎকালীন ঠিকানা এলিফ্যান্ট রোডস্থ খাইরুন্নেসা ভবনের তৃতীয় তলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০১০ সালে প্রকাশিত ডেইলি স্টারের আরেকটি প্রতিবেদনেও হিজবুত তাহরির ও নাসিমুল গনির ব্যাপারে উপরোক্ত তথ্য তুলে ধরা হয়।

এদিকে মন্ত্রীপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নাসিমুল গনির ক্যারিয়ার প্রোফাইল ঘেঁটে জানা যায় তিনি ঢাবির অর্থনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন এবং ১৯৮৩ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করা পুলিশের একটি গোয়েন্দা ইউনিট থেকে পাওয়া তথ্যমতে হিজবুত তাহরিরের সহপ্রতিষ্ঠাতা নাসিমুল গনির সম্পর্কে জানা যায়, তার আসল নাম পেট্রিক নাসিম গনি, তার আনুমানিক বয়স ৫৫ বছর। তিনি নরসিংদীর মনোহরদি গ্রামের বাসিন্দা এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে বড়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি তাঁর প্রকৌশলী পিতার সঙ্গে সপরিবারে ঢাকার খিলক্ষেত থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পাড়ি জমান। পরবর্তীতে সেখানেই তিনি উচ্চ মাধ্যমিক এবং মেডিকেল সায়েন্সের পড়াশোনা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে পেশায় একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

২০০০ সালে পেট্রিক নাসিম গণি ঢাকায় তাঁর সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদ্দেশ্যে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ঢাকায় ফিরে তিনি উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে তাঁর পিতার দেওয়া বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এই সময়ে তিনি ঢাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ব্রিটিশ কাউন্সিলে আইইএলটিএস পরীক্ষক ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের দিকে সংগঠনের দায়িত্বের প্রয়োজনে তিনি আবারও লন্ডনে ফিরে যান। সেই সময়ের পর থেকে বাংলাদেশে তাকে আর দেখা যায়নি।

এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে নামের মিল থাকলেও আমলা নাসিমুল গনি ও হিজবুত তাহরিরের নাসিম গনি দুইজন আলাদা ব্যক্তি। কারণ একজন পেশায় চিকিৎসক, অন্যজন আমলা ও অর্থনীতি গ্রাজুয়েট।

নব্বইয়ের দশকে আমলা নাসিমুল গনি বিএনপি সরকারের অধীনে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (১৯৯০), তৎকালীন ভূমিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (১৯৯১), শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব ও বাগদাদে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (১৯৯৫) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (১৯৯৯) পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে ২০০১ সালে তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেন। বিএনপির ওই আমলে জামালপুরের জেলা প্রশাসক, স্পিকারের একান্ত সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ও সর্বশেষ ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ২০০৯ সালে তাকে বিএনপিপন্থী হওয়ার অপরাধে ওএসডি করা হয় এবং ২০১৩ সালে অবসরে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে হিজবুত তাহরিরে প্রতিষ্ঠাতা নাসিম গনি নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন। এবং বিএনপি সরকারের আমলে দেশে ফিরে হিজবুত তাহরির প্রতিষ্ঠা করেন।

এসব তথ্য থেকে প্রমাণ হয় মন্ত্রী পরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে হিজবুত তাহরির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রচার করাটা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা তথ্য।

আল-জাজিরার অনুসন্ধানী আই ইউনিটের প্রযোজক হিসেবে কাজ করা জুলকারনাইন সায়ের অপতথ্য ছড়ানোর জন্য বিতর্কিত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনের আগে ও পরে একাধিকবার তাকে অপতথ্য ছড়াতে দেখা গেছে।