Image description
 

নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের তোড়জোড়ের মধ্যেই দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা বা শ্যাডো ক্যাবিনেট নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী জোটের কয়েকজন নেতা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রীদের ভূমিকা কী—তা নিয়ে এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে। সেখানে বিরোধী দল সরকারে থাকা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে নিজেদের একজন করে মুখপাত্র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকে ঠিক করে দেয়, যাকে বলা হয় ছায়া মন্ত্রী। তারা মূল মন্ত্রীদের কাজ পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন।

যুক্তরাজ্যের সংসদীয় চর্চা অনুযায়ী, ছায়া মন্ত্রীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, প্রকল্প ও নীতির ওপর নিয়মিত নজর রাখেন। সংসদে প্রশ্ন তোলা, তথ্য চাইতে বাধ্য করা এবং নীতিগত দুর্বলতা তুলে ধরা তাদের প্রধান কাজ। এর মাধ্যমে বিরোধী দল নিজেকে একটি সম্ভাব্য বিকল্প সরকার হিসেবে প্রস্তুত রাখে।

ছায়া মন্ত্রীদের কাজ শুধু সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজন—নিয়োগকর্তা, কর্মী, বিশেষজ্ঞ, সরবরাহকারী ও গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাও তাদের দায়িত্বের অংশ। এতে তারা মাঠপর্যায়ের সমস্যা, নীতি বাস্তবায়নের ঘাটতি ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক অবস্থান নিতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অবকাঠামো খাত ধরা যায়। শিক্ষা খাতের ছায়া মন্ত্রী স্কুল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বা অপচয়ের অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানাতে পারেন। এতে সরকারও চাপের মুখে সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ফলে জবাবদিহি জোরদার হয়।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতেও ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যক্রম বেশ সক্রিয়। এসব দেশে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রীরা নিয়মিতভাবে সরকারি সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে বিকল্প প্রস্তাব দেন এবং গণমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি বিরোধী দলে থাকার সময় দলটির নেতা কিয়ার স্টারমার একটি শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। পরে নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করলে সেই ছায়া মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই প্রকৃত মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পান—যা এ ব্যবস্থার বাস্তব কার্যকারিতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন। এখানে আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির নেই। সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক–এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে বিরোধী দল আরও কাঠামোবদ্ধ ও তথ্যভিত্তিকভাবে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের ভেতরে নীতিনির্ভর বিতর্ক জোরদার করা, বিকল্প প্রস্তাব তৈরি এবং রাজপথের সংঘাতের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ছায়া মন্ত্রীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।