Image description

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অন্যদিকে সংসদে কার্যকর বিরোধী ভূমিকা রাখতে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোট নেতারা বলছেন, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য আনতেই তাদের এ উদ্যোগ। বিরোধী দলের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা হলো বিরোধী দলের গঠিত একটি বিকল্প মন্ত্রিসভা কাঠামো। যেখানে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের নীতি, কার্যক্রম ও ব্যয় পর্যালোচনা করেন। প্রয়োজন হলে সমালোচনা করেন এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও নীতিগত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বিশ্বের অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে এটি সুপরিচিত একটি কাঠামো। মূলত বিরোধী দল সরকারকে কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ ও চ্যালেঞ্জ জানাতে এই বিকল্প মন্ত্রিসভা গঠন করে। এ কাঠামোয় সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতি, কার্যক্রম ও ব্যয় নিয়ে বিশ্লেষণ করেন তিনি। সংসদে বিতর্কে সরাসরি জবাব দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্যের। পাশাপাশি তুলে ধরেন বিকল্প প্রস্তাব। এই পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়েস্টমিনস্টার ধারার গণতন্ত্রে।

ছায়া মন্ত্রিসভা কেমন হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির মানবজমিনকে বলেন, গণতান্ত্রিক বিশ্বে সরকার যেমন মন্ত্রিসভা গঠন করে, বিরোধী দলও তেমনি একটি সমান্তরাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। এর কাজ হলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা, গঠনমূলক সমালোচনা করা ও প্রয়োজনে সহযোগিতা করা।

তিনি বলেন, যা ভালো তা ভালো বলবো, যা সংশোধনের প্রয়োজন তা যুক্তি-তথ্যসহ তুলে ধরবো। অনেক দেশে দেখা যায়, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি থাকেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত, নীতি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেন। কোথাও ঘাটতি থাকলে তা সংসদে উত্থাপন করেন, আর ভালো উদ্যোগকে সমর্থন দেন।

শিশির মনির জানান, প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, আইন, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। তার ভাষ্য, এসব মন্ত্রণালয় রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এসব খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু সরকারের একার বিষয় নয়। বিরোধী দলে যদি অভিজ্ঞ ও যোগ্য লোক থাকে, তাহলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়। ছায়া মন্ত্রিসভা সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক বিচারক ড. শাহজাহান সাজু মনে করেন, ছায়া মন্ত্রিসভা জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। মানবজমিনকে তিনি বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা মন্ত্রণালয়ের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরে। একইভাবে জনবান্ধব মন্ত্রণালয় গড়তে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করে। তার মতে, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে এবং নীতিগত আলোচনা শক্তিশালী হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভার প্রস্তাব মানতে সরকার বাধ্য নয়। সরকার যদি মনে করে প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রের জন্য ভালো, তাহলে গ্রহণ করবে। সঠিক মনে না করলে গ্রহণ করবে না। ড. সাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, ছায়া মন্ত্রিসভা মূলত একটি নীতিগত ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কাঠামো, যার মাধ্যমে বিকল্প চিন্তা ও সমালোচনার জায়গা তৈরি হয়; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের হাতেই থাকে।

একই মত প্রকাশ করেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার। তিনি বলেন, দেশে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনার মতো কার্যকর কোনো প্ল্যাটফরম নেই। তার ভাষায়, এখন অনেক গণমাধ্যমও সরকারের সমালোচনা করে না। অথচ সমালোচনা রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনা মানেই বিরোধিতা নয়; বরং এটি নীতি-নির্ধারণে সংশোধন, ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম। সরকারের সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা না থাকলে সুশাসন ব্যাহত হতে পারে। ড. খন্দকারের মতে, এ প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলের ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে। কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা কনসেপ্ট ইতিবাচক বলে মনে করি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ছায়া মন্ত্রিসভা থাকলে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা হবে। এতে নীতিগত প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিকল্প প্রস্তাব সামনে আসবে। যা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে বলে তিনি।