Image description

‘আত্মঘাতী বাঙালী’ পশ্চিমবঙ্গের লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। যেখানে লেখক ১৯০০ সালের আশেপাশের বাঙালি জীবনের উত্থান ও পরবর্তী পতন চিত্রায়িত করে দেখানো হয় কীভাবে জাতি নিজেদের অজান্তেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এখনো কী বাঙালির মননে আত্মঘাতী চেতনা রয়ে গেছে? জুলাই গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না করলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। অথচ ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে পঞ্চগড় সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় একটি কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়া হয়েছে।

পরের দিন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। আওয়ামী লীগের অফিসের এই খুলে দেয়ার সচিত্র খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। পঞ্চগড় আর ঠাকুরগাঁওয়ের পাশাপাশি খুলনা মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও ভারতে পলাতক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের ঘটনা ঘটেছে। পটুয়াখালির দশমিনায় আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের লালদীঘিতে শেখ মুজিবের কলিমালিপ্ত মুর‌্যাল ধুইয়ে-মুছে পরিষ্কার করার সচিত্র খবর ভাইরাল হয়েছে। ঢাকায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছেন। এসব ঘটনা কী আলামত দেয়? তাহলে কী দেশের রাজনীতির মাঠে সহসাই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে? সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় বইছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আজ নির্বাচিত এমপিরা শপথ গ্রহণ করবেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। জাতীয় সংসদ ভবনের এমপি এবং দক্ষিণ প্লাজায় উন্মুক্ত মঞ্চে মন্ত্রীদের শপথ ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কারা মন্ত্রী হচ্ছেন, প্রতিমন্ত্রীর পদ কারা পাচ্ছেন, কোন জেলায় কতজন মন্ত্রী পাচ্ছে এসব নিয়ে উৎসুক মানুষের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমপি-মন্ত্রী এবং নতুন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে হৈচৈ করার কথা। মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন তা নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠার কথা। কিন্তু কারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন সে আলোচনার পাশাপাশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের নাম।

সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেছে দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলা নিয়ে। আজ শপথ গ্রহণের পর বিএনপি সরকার গঠন করবে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে। ড. ইউনূস চলে যাওয়ার পর পরই কী পলাতক আওয়ামী লীগ ফের দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠবে? নির্বাচনের পর হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেয়া এবং আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাদের মিছিল করার দৃশ্যই সে বার্তা দেয়। তাহলে কী ‘আত্মঘাতী বাঙালী’র মতোই পর্দার আড়াল থেকে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে?

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের পর কয়েকটি জেলায় আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেয়া এবং কার্যক্রম বন্ধ থাকা দলটির কর্মী সমর্থকদের মিছিল, জমায়েতের ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বিদায়ের আগ মুহূর্তেই আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা সাধারণ মানুষ ভালভাবে দেখছে না। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আওয়ামী লীগকে ফেরাতে কৌশল নিচ্ছে রিফাইন আওয়ামী লীগ। দুর্নীতি করেননি এবং বিতর্কিত হননি এমন কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা।

আওয়ামী লীগের ভিতরে বিতর্কিত হননি এবং দুর্নীতি করেননি এমন দাবি তুলে সাবের হোসেন চৌধুরী ও শিরিন শারমীন চৌধুরীর নেতৃত্বে রিফাইন আওয়ামী লীগ সক্রিয় করার প্রচেষ্টা হয়েছিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে। প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ গত বছরের ৯ অক্টোবর দলবেঁধে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ করে গোপনে সাবের হোসেন চৌধুরীর বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য রিফাইন আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দেয়ার চেষ্টা। ঢাকায় কর্মরত কূটনীতিকদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে।

গোটা জাতি যখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে তখন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর আ ক ম জামাল উদ্দিনসহ পাঁচ জন শিক্ষক। পুলিশ তাদের আটক করে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়। এসময় প্রফেসর আ ক ম জামাল উদ্দিন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি পোস্ট দিয়ে আওয়ামী লীগ অনুসারী সকলকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পোস্টে তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ আমলে ‘বঞ্চিত’ দাবি করে লেখেন, ‘ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্ন বাসভবনে গমন করে অশ্রুপাত ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করবো আজ বিকাল ৪টায়। আপনাদের দলে দলে যোগদান করার অনুরোধ করছি’।

মূলত গত বছরের ৯ অক্টোবর নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতরা ফ্ল্যাগ ছাড়া তথা কোনো কূটনৈতিক শিষ্টাচার না মেনেই একই গাড়িতে চড়ে সাবের হোসেনের গুলশানের বাসভবনে প্রবেশ করেন। মানুষের নজর এড়াতে তারা বৈঠক শেষে বাসভবনটি থেকে বেরিয়ে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করে চলে যান। মূলত রিফাইন আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করে তুলতে এ চেষ্টা করা হয়। ওই সময় সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, ফোরটিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট নামের ৬টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়ে তথাকথিত মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গ তুলে গণতন্ত্র চর্চা এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগকে কার্যত রাজনীতি করার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব দেন।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) ওয়েবসাইটে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই চিঠি প্রকাশের পর ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ত্রয়োদশ সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি তোলেন। মূলত আওয়ামী লীগের নেতারা পালিয়ে গেলেও এখনো দেশে শতকরা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আওয়ামী লীগ অনুগত ভোটার রয়েছেন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ওই ভোটার ও জাতীয় পার্টির ভোটারদের বড় অংশ বিশেষ করে মহিলারা উত্তরাঞ্চলে চারটি জেলায় টাকার বিনিময়ে জামায়াত জোটকে ভোট দিয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে (রংপুর, নিলফামারি, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধায় জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় চার জেলাকে ‘জান্নাতি জেলা’ টোল করা হচ্ছে)। আওয়ামী লীগকে সংসদে পুনর্বাসনের ভারতের নীল নকশা ‘সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন’ দাবিতে জামায়াত রাজপথ গরম করে তুলেছিল। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ অনুসারী কিছু নায়ক-নায়িকা, কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মী সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ ফেরানোর দাবির পক্ষে নেট দুনিয়া গরম করে তুলেছেন। বিদেশে পলাতক কিছু প্রবাসী ইউটিউবার ও কন্টেইন ক্রিয়েটরকে নেট দুনিয়ায় মাঠে নামানো হয়েছে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে ওই সাংবাদিক-ইউটিউবাররা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং আওয়ামী লীগে রাজনৈতিক স্পেস দেয়ার জন্য নানান বক্তব্য তুলে ধরছেন। ভারতে পালিয়ে থেকে শেখ হাসিনা প্রায়ই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হুংকার দিচ্ছেন। জ্বালাও পোড়াওয়ের নির্দেশনা দিচ্ছেন। হামলা-ভাংচুরের নির্দেশনা দিচ্ছেন। এমনকি যে কোনো সময় কাউকে কাউকে হত্যার হুমকি এবং যে কোনো সময় দেশে প্রবেশের হুংকার দিচ্ছেন। সজীব ওয়াজেদ জয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে একই হুংকার দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু কী তাই সজীব ওয়াজেদ জয় শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে ওয়াশিংটনে লবিষ্ট নিয়োগ করেছেন। তারাও ট্রাম প্রশাসনকে আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের উপর নানামুখী চাপ দেয়ার চেষ্টা করছে। মূলত আওয়ামী লীগ বিপুল পরিমাণ পাচার করা অর্থ ব্যয় করে এসব করছে। টাকার বিনিময়ে দেশের ভিতরে কেউ কেউ আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

দেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি এখনো জোরালো দাবি রয়ে গেছে। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিলেও দলটিকে এখনো নিষিদ্ধ করেননি। হামলা-মামলা এবং জ্বালাও পোড়াও করলেও সব নাগরিকের অধিকারের কথা বিবেচনা করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থা গ্রহণ করেননি। তবে আওয়ামী লীগের যারা হত্যাকা- ঘটিয়েছেন, যারা সন্ত্রাস করেছেন এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তাদের ব্যপারে নমনীয় হননি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও আওয়ামী লীগকে ‘না’ করার ব্যাপারে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান এবং আগামীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকলকে নিয়ে দেশ পরিচালনার বার্তা দিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অযথা কাউকে হয়রানি না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নির্দোষ নেতাকর্মীদের যাতে বিনা কারণে হয়রানি না করা হয় সে নির্দেশনা দিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোরতা এবং তারেক রহমানের এই নির্দেশনা প্রশংসনীয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগকে ফের রাজনীতি করার সুযোগ দিতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেয়া এবং গণতন্ত্র চর্চার নামে আওয়ামী লীগের রাজনীতি উন্মুক্ত করার অপচেষ্টা হবে ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ নামান্তর। ভারতের অনুগত আওয়ামী লীগ বিষধর সাপের চেয়েও হিংস্র। সুযোগ পেলেই ছোবল দেবেই। অতএব, সাবধান!