৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির মামলায় জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীর রিমান্ড আবেদন করতে যাচ্ছে পুলিশ। আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি) গাজীপুর চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি রয়েছে এই মামলার।
জানা গেছে, সুরভীকে ২১ বছর বয়সী দেখিয়ে এই রিমান্ড আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। তবে জন্ম সনদ বলছে, এখনও ১৮ বছরই পূর্ণ হয়নি তার। যদিও পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারে বাদির দেওয়া তথ্যানুযায়ীই বয়সের তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।
শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের রিমান্ড আবেদনের সুযোগ নেই। এমনকি এমন শিশুদের কারাগারেও থাকার কথা নয়। কিন্তু সুরভীর ক্ষেত্রে এটি মানা হয়নি।
২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় তাহমিনা জান্নাত সুরভীর নামে ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজির মামলা করেন সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয়। মামলার এজাহারে সুরভী ২০ বছর বয়সী বলে উল্লেখ করেন তিনি। একইদিন মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী প্রস্তুত করে পুলিশ।
এজাহারে সুরভীর পরিচয় সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও তথ্য বিবরণীতে সুরভীর পিতা, গ্রাম ও থানা উল্লেখ করা হয় ‘অজ্ঞাত’। এজাহারে উল্লেখ পিতা, গ্রাম ও থানা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক নিশ্চিত না হলেও বয়সের ক্ষেত্রে ভীন্ন চিত্র দেখিয়েছে পুলিশ। তারা কর্তৃক প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, সুরভীর বয়স ২১।
অন্যদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির সংগঠক তাহমিনা জান্নাত সুরভী অভ্যুত্থানের সময় এসএসসি অধ্যরনরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছেন। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ২০১৮ সালে নিবন্ধিত সুরভীর জন্ম সনদ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সুরভী। সে অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত সুরভীর বয়স হয় ১৭ বছর ১ মাস ৭ দিন।
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য ‘শিশু আইন, ২০১৩’ নামক মোট ১০০টি ধারার বিশেষ আইন আছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণ কল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হবে।
সেখানে আরও বলা হয়েছে, শিশুর মাধ্যমে সংঘটিত যেকোনো অপরাধের বিচার করবে শিশু আদালত এবং অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অথবা বিচারে দোষী সাব্যস্ত শিশুকে সাধারণ জেল হাজতের পরিবর্তে নিরাপদ হেফাজতে বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখতে হবে।
শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে রিমান্ডে নেওয়ারও সুযোগ নেই। শিশুসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে (কনভেনশন) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে শিশু আইনে এটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ। এছাড়া ২০১৬ সালের একটি মামলায় একটি শিশুকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার শিশু আদালতের বিচারক রুহুল আমিন এ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট আদেশ দিয়েছিলেন।
এছাড়া, শিশু আইনে অভিযুক্তের ক্ষেত্রে জামিনেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এদিকে, পুলিশ সুরভীর বয়স বাড়িয়ে ২৬ ডিসেম্বর তাকে আদালতে উপস্থাপন করে। ফলে সুরভীর জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠান আদালত।
গতকাল (রবিবার) আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদ খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছিলেন, মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো জব্দ তালিকা নেই। কোনো চার্জশিটও দাখিল হয়নি। কবে নাগাদ হবে, তা বলতে পারছি না। এর আগে সুরভীর জামিন নামঞ্জুর করা হয়েছে। কাল (সোমবার) শুনানিতে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করবে। যদি রিমান্ড নামঞ্জুর হয়, তাহলে আমরা কালকেই উচ্চ আদালতে যাব। আর রিমান্ড মঞ্জুর হয়, তাহলে প্রতিবেদন আসার পর যাব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রিমান্ড আবেদন গ্রেফতার হওয়ার পরই হওয়ার কথা। আজ এ মামলার শুনানি হওয়ার কথা। আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন, রিমান্ড হবে কি হবে না। আসামীর বয়স ২১ নাকি ১৭, সেটির সত্যতার বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। আমার এ থানায় জয়েনিং হয়েছে মামলাটি এন্ট্রি হওয়ার পরে। আর এটি এখনো তদন্তাধীন। বাদী এজাহারে যে বয়স উল্লেখ করেছে, আসামির বয়স পুলিশ সেভাবেই হয়তো রেকর্ড করেছে। যদি উনার বয়স কম হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিষয়টি আইন দেখবে।
প্রসঙ্গত, গত ২৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন তাহরিমা জামান সুরভী। এরপরই পুলিশ সূত্রে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে লেখা হয়, ‘সম্প্রতি গুলশানের এক ব্যবসায়ীকে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আদায় করে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তদন্তে উঠে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তাহরিমা জামান সুরভীই ওই চক্রের মূল নেতৃত্বে ছিলেন। এই চক্রটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা আদায় করেছে।’
ওই সময়ে মামলার বিবরণের সূত্র দিয়ে গণমাধ্যমে আরও বলা হয়, ‘গত বছরের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় সংঘটিত হত্যা মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে অর্থ আদায় করা হয়। আসামি বানানো, পুলিশি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর পাশাপাশি ‘মীমাংসা’ করে দেওয়ার প্রলোভনে চক্রটি বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করে এবং আদায় করে নেয়।’
তবে মামলার বিবরণে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে মামলার বাদির দাখিলকৃত এজাহারের মিল পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ৩৪২, ৩২৩, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৭৯ ও ৫০৬ ধারায় মামলাটি রুজু করে পুলিশ।