ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে সারা দেশে ৩০০ আসনে ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, মনোনয়নপত্র বাতিলের হার মোট প্রার্থীর ২৮ শতাংশ।
মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল মোট ২ হাজার ৫৬৮টি। বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২টি বৈধ ঘোষিত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন। ইসি জানিয়েছে, খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করায় ওই তিন (ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসন) আসনে তাঁর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রাখা হয়নি।
মনোনয়পত্র বাতিল ও বৈধ প্রার্থীর হিসাব গতকাল রোববার রাতে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে দেখা যায়, বিএনপির ২৫, জামায়াতে ইসলামীর ১০, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯, জাতীয় পার্টির (জাপা) ৫৯, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ২৫ এবং স্বতন্ত্র ৩৩৮ জন প্রার্থীর মনোনয়পত্র বাতিল হয়েছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া অন্য প্রার্থীরা অন্যান্য দলের। বিএনপির ক্ষেত্রে অনেকে দলীয় মনোনয়ন জমা দেননি বলে বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ, এঁদের অনেকে বিদ্রোহী প্রার্থী।
সারা দেশে ৩০০ আসনে ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, মনোনয়নপত্র বাতিলের হার মোট প্রার্থীর ২৮ শতাংশ।
মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসির কাছে আপিল করা যাবে। আজ সোমবার ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নেওয়া হবে আপিল আবেদন। আবেদন গ্রহণের জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে অঞ্চলভিত্তিক বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, গতকাল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব (বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান) মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বেশ কিছু জেলায় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
শেষ দিনে জামায়াতের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায়। এই খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। আর নেত্রকোনা-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে একটি মামলার তথ্য গোপন করে নিজেকে খালাস দেখানোর কারণে। দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় গতকাল চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
ইসি জানিয়েছে, খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করায় ওই তিন (ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসন) আসনে তাঁর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রাখা হয়নি।
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের ১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ১৪৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে বাছাই শেষে বাতিল হয়েছে ৪২ জনের মনোনয়নপত্র। প্রার্থিতা টিকেছে ১০১ জনের। গতকাল চট্টগ্রামে ৭টি আসনে ১৬ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
ফরিদপুর-১ আসনের ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনের মনোনয়নপত্র প্রথমে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংশোধনী জমা দিতে সক্ষম হওয়ার তাঁদের মধ্যে ৭ জনের মনোনয়নপত্র গতকাল বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কারণে সিলেটের তিনটি আসনের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র এর আগে স্থগিত করা হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর গতকাল শেষ দিনে তাঁদের মধ্যে দুজনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তাঁরা হলেন সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক ও সিলেট-৬ আসনে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান। তবে সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তবে ঢাকা-১৮ আসনে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র শনিবার বাতিল হয়। কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় গত শুক্রবার। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় শনিবার (কিশোরগঞ্জ-৫)। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দলের নতুন নেতৃত্বসংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় হালনাগাদ না হওয়ায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ইসি জানিয়েছে, সারা দেশে ৩০০ আসনে ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে জমা পড়েছিল দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাকি ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে আপিলগুলো ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে নিষ্পত্তি করবে ইসি। প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। এরপর চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে। ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এর পর থেকে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচার। ভোট গ্রহণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও হবে।
বর্তমানে ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এর বাইরে নিবন্ধিত আটটি দল নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। এসব দল হলো বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরীকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম)।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পরিচিতি পেয়েছিল ‘ডামি নির্বাচন’ নামে। ওই নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল। তখন ইসিতে নিবন্ধিত দল ছিল ৪৪টি। এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন পরিচিতি পায় ‘রাতের ভোট’ হিসেবে। সেখানে নিবন্ধিত ৩৯টি দলের সবাই অংশ নিয়েছিল।