হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে ৮১০ কোটি টাকার পণ্য পুড়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে-জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, ওষুধ তৈরির কাঁচামাল, হিমায়িত খাদ্য, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্সসামগ্রী, মোবাইল ফোন, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, তৈরি পোশাক শিল্পের অ্যাকসেসরিজ, খাদ্যপণ্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ ইত্যাদি।
ঢাকা কাস্টমস সূত্র জানায়, আগুনে শতভাগ ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কেননা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আমদানিকৃত প্রতিটি পণ্যের পৃথক শনাক্ত নম্বর, ডিজিটাল লগ, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং থাকে। শাহজালাল বিমানবন্দরে সেই ব্যবস্থা ছিল না। তাছাড়া আমদানিকৃত পণ্যের কাস্টডিয়ান বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের ধরন, কোথায় কোন পণ্য ছিল, কোন বাক্সে কী ছিল, কোন চালান কোন স্থানে রাখা ছিল-এসবের ডিজিটাল রেকর্ড না থাকায় পুড়ে যাওয়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য কত তা জানা সম্ভব নয়।
সূত্র আরও জানায়, আগুন লাগার ৩ মাস আগ পর্যন্ত কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা সিস্টেমে উল্লিখিত আইজিএম (ইমপোর্ট জেনারেল মেনিফেস্ট-যেখানে পণ্যের বিবরণ, আমদানিকারকের নাম ও ঠিকানা, বিল অব লেডিং বা এয়ারওয়ে বিল নম্বর, ওজন, মূল্য, পোর্ট অব লোডিংয়ের তথ্য থাকে) ও বিল অব এন্ট্রির তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, ৮১০ কোটি টাকার পণ্য বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ছিল। এছাড়া বহু চালানপত্র ও নথি আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণের হিসাব নির্ধারণ এবং মালিকানা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অবশ্য আড়াই মাস পার হলেও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) গঠিত কমিটি এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রতিবেদন দিতে পারেনি। যদিও স্বরাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কোর কমিটি ইতোমধ্যেই একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দিয়েছে। এমনকি বিমান বাংলাদেশ ও ফায়ার সার্ভিস গঠিত কমিটিও প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছে।
বিমানবন্দরে আগুন লাগার পর আইআরডির যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারীকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের কমিটি করা হয়। অন্য সদস্যরা হলেন- এনবিআরের প্রথম সচিব মু. রইচ উদ্দিন খান, তারেক হাসান, ঢাকা কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান ও আইআরডির উপসচিব পঙ্কজ বড়ুয়া। গঠিত এ কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী যুগান্তরকে বলেন, প্রতিবেদনের খসড়া করা হয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটি জমা দেওয়া যাবে বলে আশা করছি।
তদন্ত কমিটির একজন্য সদস্য যুগান্তরকে বলেন, কাস্টমস আইন অনুযায়ী আমদানি করা পণ্য ২১ দিনের মধ্যে খালাস করার নিয়ম রয়েছে। তবে নানা কারণে তা মাসের পর মাস গুদামেই পড়ে থাকে। আমদানি পণ্যের কাস্টডিয়ান বিমান কর্তৃপক্ষ হওয়ায় কার্গো শেডের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের। এক্ষেত্রে কাস্টমসের করণীয় নেই। কাস্টমস আইন অনুযায়ী পণ্য ২১ দিনের মধ্যে খালাস করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সময়সীমা না মানলে আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি শুল্ক, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিমান, নিরাপত্তা সংস্থা, ফায়ার সার্ভিসসহ সব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী সমন্বয় কমিটি গঠনেরও সুপারিশ থাকবে।
এর আগে আগুন লাগার একদিন পর ২০ অক্টোবর রপ্তানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) জানায়, আগুনে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের বিপরীতে বিমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিমার আওতার বাইরে থাকা পণ্যের জন্য সরকারি বিশেষ তহবিল গঠন করে ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা নিশ্চিত করারও দাবি জানায় সংগঠনটি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) তথ্য অনুযায়ী, আগুনে ৪৫টি কোম্পানির ৪৪২ ধরনের ওষুধের কাঁচামাল পুড়ে গেছে। এতে ভ্যাট-ট্যাক্স ও অন্যান্য শুল্ক বাদে মোট ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকা।