আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরে দেশে প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি গুম হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯ জনকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে গুম কমিশন। এছাড়া কমিশন তদন্তকালে নিশ্চিত হয়েছে গুম হওয়ার পর মারা গেছেন ২৮৭ জন।
এদিকে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় মিলেছে ৬১ শতাংশের। এ তালিকার হাই প্রোফাইলদের গুম করা হয় তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে। যাদের অনেককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গুম সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের শিকার ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের। তবে এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।
প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রোববার জমা দিয়েছে কমিশন। এর আগেও তিন দফায় আংশিকভাবে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমাকালে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, কমিশনের সদস্য-বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এ তালিকায় থাকা অন্যতম ব্যক্তি হলেন-বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক গুমের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা নিজে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে এতে স্পষ্ট হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী র্যাব, পুলিশ, ডিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাই গুমে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঘটনায় একাধিক বাহিনীর যৌথ সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে ৪৭৬ জন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী। ২৩৬ জন ছাত্রশিবিরের, ১৪২ জন বিএনপির, ৪৬ জন ছাত্রদলের এবং ১৭ জন যুবদলের নেতাকর্মী। এ হিসাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কমিশন গঠনের পর গুমের শিকার পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়েছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসাবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমাদানকালে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে এ প্রসঙ্গে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভুক্তভোগীর খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা অন-রেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’ তিনি বলেন, জোরপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যে ডেটা পেয়েছি, তা দিয়ে নিশ্চিত প্রমাণিত হয়-এসব পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম।
অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনার বর্ণনা করলেন, পৈশাচিক বলে যে শব্দ আছে বাংলায়, এককথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়। এই নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে যারা গেছেন, আপনারাও তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই নৃশংস ঘটনাগুলোর কথা শুনেছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা যেত না।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, সেটার ডকুমেন্টেশন এই রিপোর্ট। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বীভৎস হতে পারে-এটা তারই ডকুমেন্টেশন। যারা এ ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদের মতোই মানুষ। নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। জাতি হিসাবে এ ধরনের নৃশংসতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে। এই নৃশংসতা যেন আর ফিরতে না পারে, সেই প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করতে হবে।’ রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যতের করণীয় পেশ করার বিষয়েও নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। এছাড়া আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব জায়গায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সে জায়গাগুলো ম্যাপিং করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।