শামীম হাসান দম্পতির বিদেশে বেড়ানোর খুব শখ। সুযোগ পেলেই বছরে একবার বিদেশে ঘুরতে যান এ দম্পতি। গত বছরের নভেম্বরে সিদ্ধান্ত নিলেন ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপন করতে তারা ব্যাংকক যাবেন। দুজন ভিসার জন্য আবেদন করলেন। চার বছর আগে থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন। চটজলদি ভিসা পাওয়া যাবে, তাই চিন্তাহীনভাবেই তারা ভিসা আবেদন করলেন। কিন্তু আবেদনের পর দিনের পর দিন চলে যায়, শামীম তার পাসপোর্ট ফেরত পান না। নিজে উদ্যোগী হয়ে খোঁজ নিলেন। জানলেন থাইল্যান্ডের ভিসা পেতে এখন সর্বনিম্ন ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। শামীম দম্পতির বিদেশে গিয়ে ইংরেজি বর্ষবরণ হলো না। শামীম একা নন। বিদেশে যেতে ভিসা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে অনেককেই। অনেক দেশই বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেখলে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে?
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং সম্মানিত। সারা বিশ্বে রয়েছে তাঁর বিশেষ পরিচিতি। সবাই আশা করেছিল অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশ ভ্রমণ আরও সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সব দরজা। কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা না থাকার পরও বাংলাদেশিদের ভিসা দিচ্ছে না বেশ কয়েকটি দেশ। বিদেশে পড়তে, কাজ করতে কিংবা বেড়াতে যেতে আগ্রহীদের অনেকেই জানিয়েছেন এমন অভিযোগ। একই সমস্যার কথা জানিয়ে পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, দেশগুলো ভ্রমণসহ অনেক ধরনের ভিসা দিচ্ছে না। ‘ইন্ডিয়া, ইউএই, কাতার, বাহরাইন, ওমান, উজবেকিস্তান, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম এসব দেশ আমাদের ভিসা দিচ্ছে না’, বলছিলেন ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- টোয়াবের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান। ‘শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডের ভিসা অনেক বেশি সময় নেয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ভিসার রেশিও কম। ফিলিপাইন অনেক বেশি সময় নেয়। ইন্দোনেশিয়ার ভিসা ফি অনেক। এমনকি অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়া শ্রীলঙ্কার ইলেকট্রনিক ভিসা হতেও সময় নিচ্ছে দুই-তিন দিন’, বলেন তিনি।
২০২৪ সালের পাঁচ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয় ভারত। দেশটির এই সিদ্ধান্তকে অনেকটা রাজনৈতিক হিসাবে দেখা হলেও ঘোষণা ছাড়াই ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার অনেক দেশ থেকে সব ধরনের ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতগুলো দেশের ভিসা নিয়ে এমন জটিলতা খুব বেশি দিনের নয়।
এ নিয়ে পর্যটন ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন সেলিম জানান, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছরই বাংলাদেশিদের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ ভি১, ভি২ ভিসা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই বছর দেশটির দূতাবাস ‘মনে হয় না দুই লাখের বেশি ভিসা দিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘ইউএস বলেন, অস্ট্রেলিয়া বলেন বা কানাডা কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে আমাদের অনেক ভিসা দিয়েছে, পাসপোর্টের মেয়াদ যতদিন, ততদিন পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু এ বছর কিন্তু কোনো ভিসা দিচ্ছে না, ‘বলেন সেলিম’।
বিদেশে পড়তে যেতে লম্বা সময় ধরে চেষ্টা করেছেন, পেয়েছেন স্কলারশিপও। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যেতে পারেননি ভিসা পাননি বলে। এমন ঘটনা ঘটেছে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গেই। তেমনই একজন তানজুমান আলম ঝুমা। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হাঙ্গেরি আর যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। পেয়েছেন স্কলারশিপও। কিন্তু শুধু ভিসা জটিলতার কারণে যেতে পারেননি দুই দেশের কোনোটিতেই।
‘অক্টোবরে বুদাপেস্টে অ্যাপ্লাই করি। জানুয়ারিতে ওটা আমার জন্য ‘নো’ হয়ে আসে। পরে জানুয়ারিতে ইউএসের জন্য অ্যাপ্লাই করি। মোটামুটি গত ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরের কিছু বেশি সময় আমার এর পেছনে চলে গেছে, বলেন তিনি।
শুধু শিক্ষার্থী ভিসাই নয়, বহুদেশ ঘোরা ব্যক্তি কিংবা কাজের জন্য শ্রমিক ভিসাও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ভিয়েতনাম কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো যে দেশগুলো থেকে সহজেই ভিসা পাওয়া যেত এতদিন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে ভিসা দিচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। অথচ ভারতের পর্যটন ভিসা ছাড়া কার্যত কোনো দেশ থেকেই বাংলাদেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিসার অপব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে কমেছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এ ছাড়াও দেশের বাইরে রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের প্রকাশ্য বিবাদে জড়ানোর কারণেও নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। ভিসা জটিলতার কারণ হিসেবে অনেকেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কারণ হিসেবে মনে করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মূল আরও গভীরে। তাদের মতে, অনিয়মিত পথে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দেশে ঢোকার প্রবণতা, আর তা করতে সহজলভ্য দেশের ভিসা নিয়ে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর ঘটনা দেশগুলোর প্রশাসনের চোখে পড়েছে। ‘ভিসা পাওয়ার সুযোগে বা এটাকে অপব্যবহার করে অনেকে কিন্তু অনিয়মিতভাবেও যাচ্ছে। এবং সে প্রবণতার কারণেই আমার ধারণা যে দেশগুলোতে খুব বেশি অভিবাসনবিরোধী বাতাবরণ নেই সেই দেশগুলোও কিন্তু এখন সতর্ক হচ্ছে। যেমন ধরুন ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ‘বলছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর। এমনকি কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে লোক পাঠিয়ে শ্রমিক ভিসায় রূপান্তর করেন বলেও অভিযোগ আছে। আবার প্রতিবেশী দেশ থেকে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা ভিসা নিয়ন্ত্রণের কারণে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু দেশ আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। যার কারণে অল্পসংখ্যক মানুষের ‘অনিয়মিত’ বা আইনবহির্ভূত কাজে যুক্ত থাকার ফল অনেক বেশিসংখ্যক মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে সেসব দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে কোন্দল বা বিবাদে জড়ানোর ঘটনাও দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে নানা দেশের ভিসা জটিলতায়। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে পাসপোর্টের র্যাঙ্কিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্যমতে, দুর্বলতম পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বিশ্বের ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগ আছে বাংলাদেশের নাগরিকদের। এই তালিকার বেশির ভাগ দেশই আফ্রিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের, যেখানে বাংলাদেশিদের যাতায়াতের প্রবণতাও কম। এ ছাড়াও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অবৈধ অভিবাসনের সুযোগ খোঁজার প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের ভিসা সীমিত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে অন্য দেশে সরাতে কূটনীতিকদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
তিন মাস পর মার্চ মাসে ঢাকা থেকেই ৯টি দেশের ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়, কিন্তু সেই দেশগুলো থেকেও ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা যাচ্ছে।
কয়েক মাস আগে সংবাদমাধ্যমে ভিসা জটিলতার কথা স্বীকার করে নেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা। দায়ী করেন, বাংলাদেশিদের কর্মকাণ্ডকে। কিন্তু উ™ূ¢ত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ভ্রমণ ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতার বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ নেই। তবে ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোতে কূটনৈতিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ আছে।
সেক্ষেত্রে অসৎ উপায়ে যারা দেশের বাইরে লোক পাঠাচ্ছেন কিংবা যারা যাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবার আগে দেশের ভিতরে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানেরও পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।