ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের জমা দেয়া মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সারা দেশের রিটার্নিং কর্মকর্তারা এই কাজ শেষ করেছেন গতকাল রোববার। শেষ দিন পর্যন্ত প্রাথমিক বাছাইয়ে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থী বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া নানা রকম ভুল-ভ্রান্তির কারণে ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। শেষ দিনে সারা দেশ থেকে আসা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের (ইসি) জনসংযোগ পরিচালক ও তথ্য কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক বাছাইয়ে যেসব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে তাদের জন্য আপিলের সুযোগ থাকছে। সোমবার থেকে ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত এই আপিল করা যাবে।
ইসি’র তথ্য অনুযায়ী রংপুর অঞ্চলে দাখিল করা ২৭৯ প্রার্থীর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা বৈধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ২১৯ জনকে। একইভাবে ৫৯ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের ২৬০ জনের মধ্যে বৈধ প্রার্থী ১৮৫ এবং বাতিল করা হয় ৭৪ জনের মনোনয়ন। খুলনা অঞ্চলে ২৭৫ জনের মধ্যে বৈধ ১৯৬ ও বাতিল করা হয় ৭৯ জন প্রার্থীর মনোনয়নপপত্র। বরিশাল অঞ্চলে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন ১৬২ প্রার্থী। এর মধ্যে বৈধ ১৩১ ও বাতিল ৩১ জন। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩১১ প্রার্থীর মধ্যে বৈধ ১৯৯ জন এবং বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের সংখ্যা ১১২টি। ঢাকা অঞ্চলে ৪৪২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এর মধ্যে ৩০৯ জনের মনোনয়ন বৈধ আর বাতিল করা হয় ১৩৩ জনের। ফরিদপুর অঞ্চলের ১৪২ প্রার্থীর মধ্যে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হন ৯৬ প্রার্থী। আর বাতিল বলে ঘোষণা করা হয় ৪৬ জনের। সিলেট অঞ্চলে ১৪৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে বৈধ ১১০ আর বাতিল ৩৬ প্রার্থীর। কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৫৭ প্রার্থীর মধ্যে ২৫৯ জন বৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। আর ৯৭ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৯৪ প্রার্থীর মধ্যে ১৩৮ জন বৈধ হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৬ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
ঢাকার ২০টি আসনে বৈধ ১৬১: ঢাকা জেলার ২০টি সংসদীয় আসনে জমা পড়া ২৩৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১৬১টি বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্যের ঘাটতি থাকায় বাতিল করা হয়েছে ৮১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র। রাজধানীর তিনটি পৃথক দপ্তরে হওয়া বাছাই প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা জেলা প্রশাসক এবং ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা পৃথকভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে এসব আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই করেন। এতে ১৬১ জনের মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পাশাপাশি ৮১ জনের আবেদন বাতিল এবং একজনের প্রার্থিতা স্থগিত করা হয়েছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, মূলত রাজনৈতিক দলের প্রত্যয়নপত্র (মনোনয়ন) সঠিক না থাকা, হলফনামায় প্রয়োজনীয় সই বা নথির অভাব, ঋণখেলাপি হওয়া এবং ফৌজদারি মামলার তথ্য গোপন করার কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
আপিলের বিষয়ে যা বললো ইসি: বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের বিষয়ে ইসি’র এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ৪ঠা জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই চলবে। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ কোনো প্রার্থী বা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোনো সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অথবা প্রার্থী কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে আগামী ৫ই জানুয়ারি থেকে ৯ই জানুয়ারি বিকাল ৫টা পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন।
আপিল করার নির্দেশনা-মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে আপিল: আপিল আবেদন কমিশন সচিবালয়ের সচিবের কাছে নির্ধারিত ফরমেটে দায়ের করতে হবে। আপিল দায়েরকালে মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের তারিখ, আপিলের কারণ সম্বলিত বিবৃতি এবং মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণ আদেশের সত্যায়িত কপি দাখিল করতে হবে। আপিল আবেদনের ১টি মূলকপিসহ সর্বমোট ৭টি কপি দাখিল করতে হবে। আপিল আবেদন নির্বাচন কমিশনের আপিল আবেদন গ্রহণ সংক্রান্ত কেন্দ্রে স্ব স্ব অঞ্চলের নির্ধারিত বুথে জমা দিতে হবে। আপিল আবেদন ৫ই জানুয়ারি হতে ৯ই জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ বিকাল ৫টার মধ্যে দাখিল করতে হবে। আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বা রায়ের কপি প্রাপ্তির জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন দাখিল করতে হবে। উক্ত ফরমের নমুনা নির্বাচন কমিশনে আপিল দায়ের সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় বুথ হতে সংগ্রহ করা যাবে। আপিল দায়েরকারী অথবা আপিল দায়েরকারীর পক্ষে মনোনীত ব্যক্তি আপিলের রায়ের কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
আপিল নিষ্পত্তি: মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে দাখিলকৃত আপিলসমূহ নির্বাচন কমিশন আগামী ১০ই জানুয়ারি হতে ১৮ই জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণ: সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তৎকর্তৃক মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী বা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি এবং সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’ অনুসরণ করতে হবে।’
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী, ৩০শে ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ গতকাল শেষ হয়েছে। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আজ ৫ই জানুয়ারি থেকে ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল করতে পারবেন। এসব আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ই জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০শে জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১শে জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২শে জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ করা হবে ১২ই ফেব্রুয়ারি। একইদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।