তিন স্থানে আন্দোলন কর্মসূচির কারণে গতকাল স্থবির ছিল রাজধানীর একটি অংশ। সকাল থেকে ফার্মগেট, কাওরান বাজারে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থী ও মোবাইল ব্যবসায়ীরা। পরে শাহবাগে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে পূর্ব নির্ধারিত মার্চ ফর ইনসাফ কর্মসূচি পালন করে হাদি মঞ্চ। পৃথক স্থানে এই কর্মসূচির কারণে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
সদ্য চালু হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার-এনইআইআর ব্যবস্থা বন্ধ, বিটিআরসি ভবনে হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তিসহ কয়েক দফা দাবিতে গতকাল রাজধানীর কাওরান বাজার মোড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিক্ষোভ করেন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। দিনভর তাদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানার হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে ফার্মগেটের রাস্তা আটকে আন্দোলন করেন তার সহপাঠীরা।
এনইআইআর কার্যক্রম চালুর প্রতিবাদে মোবাইল ব্যবসায়ীদের সংগঠন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর ব্যানারে গতকাল সকাল ১০টার দিকে কাওরান বাজারে সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীরা। এ সময় তারা তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন। তারা সড়কে বসে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এতে আশপাশের সড়কে পুরোপুরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ প্রথম দফায় লাঠিপেটা করে ব্যবসায়ীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। তবে তারা আবারো কাওরান বাজার টু বসুন্ধরা সিটি শপিংমল সড়কে অবস্থান নেন। শিশু সন্তান নিয়ে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সড়কে বসে পড়েন। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন তারা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, রায়টকার ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে পুলিশ। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের দোকানে ঢুকে পড়েন মোবাইল ব্যবসায়ীরা। পুলিশ কাওরান বাজারের দিকে চলে আসলে আবারো সংঘবদ্ধ হয়ে বসুন্ধরা শপিংমলের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয় মোবাইল ব্যবসায়ীরা। পুলিশ তাদেরকে আবারো ধাওয়া দিলে তারা শপিংমলের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে নিজেদেরকে ব্যবসায়ী দাবি করে বলেন- আমরা কোনো সন্ত্রাসী না, আমরা ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা বলেন, আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই জোর করে এই এনইআইআর প্রকল্প চালু করা হয়েছে। আমরা মোবাইল ব্যবসায়ীরা এখন বৌ-বাচ্চা নিয়ে না খেয়ে মারা যাবো। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি। কিন্তু আমাদের ওপর আজ অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। পুলিশের তোপের মুখে কাওরান বাজার এলাকায় টিকতে না পেরে দুপুরের পর হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজার সামনে অবস্থান নেন মোবাইল ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. শওকত আলী বলেছেন, সকাল থেকেই মোবাইল ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সোনারগাঁও ক্রসিং এলাকায় অবস্থান নেন। বেলা ১১টার দিকে তারা পুরো রাস্তা বন্ধ করে দিলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং জনভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ আইনের আওতায় থেকে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে এবং তারা তখন এলাকা ছেড়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ পর আবারো ওই ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে। তাই পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়। এ সময় সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে আন্দোলনকারীরা অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েন। আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি বলেন, পুলিশের কাছে তাদের কোনো সরাসরি দাবি জানানো হয়নি। তারা যে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানোর কথা, সেখানেই তা জানানো উচিত ছিল। কিন্তু জনভোগান্তি সৃষ্টি করে সরকারকে চাপ দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা রাস্তায় নেমেছেন বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে গত ৬ই ডিসেম্বর রাতে তেজগাঁও কলেজের ছাত্রাবাসে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানা। পরে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। তার হত্যার বিচার ও খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সকালে রাজধানীর ফার্মগেট মোড়ে অবরোধ করেন তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা মূল সড়কে অবস্থান নিয়ে ফার্মগেট মোড়ের চারদিক ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেন। এ সময় তারা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে পারে না’, ‘তুমি কে আমি কে, সাকিব সাকিব’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এতে ফার্মগেট ও আশপাশের সড়কে যানচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা বলেন, সাকিবুল হাসান রানার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচারিক পদক্ষেপ না নেয়া হলে তারা রাজপথ ছাড়বেন না। খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। ওইসময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এড়াতে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে। তারা (পুলিশ কর্মকর্তারা) শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ তুলে নেয়ার আহ্বান জানান এবং দাবি-দাওয়ার বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে শিক্ষার্থীরা পুলিশের এসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
এ সময় ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. জুয়েল রানা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি পুলিশের সর্বোচ্চ সমর্থন রয়েছে। পুলিশ তাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করা সম্ভব, তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করা হচ্ছে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা দেশের জন্য অনেক অবদান রাখে। তাই তারা দ্রুত সমাধান চায়। আমরাও দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই ঘটনার সমাধান করার চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, সাকিবুল হাসান রানার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে ইনকাল মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার চেয়ে কয়েকদিন ধরে কর্মসূচি পালন করে আসছে ইনকিলাব মঞ্চ। পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি পালন করা হয় শাহবাগে। এই কর্মসূচির কারণে দুপুরের আগেই শাহবাগ এলাকায় যানজট তৈরি হয়। হাদি হত্যার বিচার দাবিতে এই কর্মসূচিতে অনেক সাধারণ মানুষও অংশ নেন। কর্মসূচি চলাকালে আন্দোলনকারীরা ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’, ‘আমার ভাই মরলো কেন, ইন্টেরিম জবাব দে’, ‘ঢাকা না দিল্লি, ঢাকা ঢাকা’, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, গুলির মুখে কথা কবো’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’সহ নানা ধরনের স্লোগান দেন। ইনকিলাব মঞ্চ আজ এবং আগামীকালও হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি পালন করবে বলে জানানো হয়েছে।