নতুন পে-স্কেলের আওতায় এমপিওভুক্ত ৬ লাখ ২ হাজার ৩৫৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে আনতে অতিরিক্ত ১৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হবে ১২ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। বাকি অর্থ প্রয়োজন হবে পেনশন খাতে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা কবে থেকে বর্ধিত বেতন-ভাতা পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনকাঠামো নিয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অর্থ বিভাগের আদেশ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন হিসাবের পদ্ধতিও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্বের একটি কারণ। তবে চলতি বছরের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন স্কেলে বেতন দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করতে ছয় মাস সময় লেগেছিল। তিনি বলেন, ‘চলতি ডিসেম্বরের মধ্যেই এই সুবিধা চালুর জন্য অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় উভয়ই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করে পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চার ধাপে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সরকারি কর্মচারীরা সংশোধিত বেতন ও বকেয়া পাওয়ার সুযোগ পেলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এখনো চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি।
সরকারি চাকরিজীবীরা অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে তিন মাসের বকেয়া বেতনও পেতে পারেন। অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় আনতে অর্থ বিভাগের আদেশ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে আদেশ জারি করবে অর্থ বিভাগ। তবে কবে নাগাদ আদেশ জারি হতে পারে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
অর্থ বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব গণমাধ্যমকে বলেন, কবে আদেশ জারি হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, এটি একটি প্রক্রিয়ার বিষয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন পেতে কিছুটা সময় লাগবে। আমরা চেষ্টা করছি আগামী নভেম্বর অথবা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন দেওয়ার। তবে সেটি সম্ভব নাও হতে পারে।’
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন পেতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন হিসাবের পদ্ধতি।
সূত্র জানায়, মাদ্রাসায় কর্মরত জনবলের বেতনের হিসাব হাতে-কলমে করতে হয়। অন্যদিকে, স্কুল-কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার হিসাব কম্পিউটারের মাধ্যমে করা হয়। মাদ্রাসার জনবলের বেতন হিসাব হাতে-কলমে সম্পন্ন করতে সময় লাগায় নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নেও বিলম্ব হচ্ছে।
মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বাদ দিয়ে শুধু স্কুল-কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন দেওয়া সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ বিভাগের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি আসলে সম্ভব নয়। দুটি আলাদা বিভাগ হলেও মন্ত্রণালয় একই। এজন্য সবাই একসঙ্গেই নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন।’
বর্তমানে সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেছনে বছরে ১৯ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ব্যয় করে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের জন্য বরাদ্দ ১২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, মাদ্রাসার জন্য ৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৭৬৭ কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে ৩০ হাজার ৯৩২টি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৬২৮ জন শিক্ষক এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন কর্মচারী। সব মিলিয়ে এ জনবলের সংখ্যা ৬ লাখ ২ হাজার ৩৫৯।
মাসিক পে-অর্ডার (এমপিও) ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি অনুদানের মাধ্যমে মূল বেতনের শতভাগ পেয়ে থাকেন। এর সঙ্গে চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাও দেওয়া হয়। গত বছর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা মাসিক নির্দিষ্ট ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করা হয়। তবে আর্থিকভাবে সচ্ছল কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক বা সম্মানী দিলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সেই সামর্থ্য নেই।