পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু গত সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে দাপ্তরিক কাজ শেষে দুপুরের খাবার খেতে বাংলোর উদ্দেশে বের হচ্ছিলেন। উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা গাড়ির দিকে যেতেই এক নারী তার পথ রোধ করে ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত চাওয়া শুরু করেন। এ সময় ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে ঘটনাটি লাইভও শুরু করেন তিনি।
পরে ওই দিন সন্ধ্যায় পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসকের বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন রেহেনা বেগম ঊর্মি (৪৭) নামের ওই নারী। তিনি তেঁতুলিয়া উপজেলা সদর ইউনিয়নের মাগুরা এলাকার বাসিন্দা।
জেলা প্রশাসককে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, ছেলেকে গ্রাম পুলিশের চাকরি দেওয়ার কথা বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজ শাহীন খসরু তার নারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। তবে সেই ফেরত চাওয়ায় বিভিন্নভাবে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তবে এ বিষয়ে ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরুর দাবি, তিনি ওই নারীর ছেলে তো দূরের কথা, তাকেই চেনেন না। এমনকি তার অফিসে ওই নারী কখনোই আসেননি। ওই নারী আদৌ অফিসে এসেছিলেন কি না, তা যাচাই করতে তার কক্ষে চেয়ার, টেবিল ও সোফার সংখ্যা জানতে চাইলেও নারী কিছুই বলতে পারেননি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ
এদিকে ওই নারীর ফেসবুক লাইভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে তেঁতুলিয়া উপজেলাসহ জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষে তেঁতুলিয়ায় দুই দফা প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও সাময়িক কর্মবিরতি পালন করেন বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাসহ স্থানীয় মানুষ।
পরে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে উপজেলা শহরের তেঁতুলতলায় তেঁতুলিয়া উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে আরও একটি মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন থেকে ইউএনওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ, ওই নারীসহ ইন্ধনদাতা ও দুষ্কৃতকারীদের খুঁজে বের করে মানহানি বিচার ও যথাযথ আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
ভিডিওতে ইউএনও-নারীর কথোপকথন
ওই নারীর ছড়িয়ে পড়া ৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ফেসবুক লাইভে দেখা যায়, নিজের কার্যালয়ে থেকে নিচে নেমে হেঁটে যাচ্ছিলেন ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু। নিচে রাখা গাড়ির কাছে যেতেই ওই নারী কান্না করতে করতে ইউএনওকে বলছেন, ‘আপনি চাকরি দিতে চাইছেন, এখন মিথ্যা কথা বলিয়েন না।’ তখন ইউএনওর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন আনসার সদস্য এগিয়ে এলে ওই নারী বলেন, ‘আপনি ফোন নিচ্ছেন কেন? ফোন নিবেন না। নাইলে কিন্তু সমস্যা হবে, আমি গরিব লোক।’
এ সময় ইউএনও তাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘কত টাকা দিছেন?’ ওই নারী বলেন, ‘১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিছি আপনাকে। ইউএনও জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোন জায়গায় দিছেন?’ নারী বলেন, ‘আপনার অফিসে দিছি, ছয় মাস আগে। তখন ডিসেম্বর মাস। তিন মাস আগেও তো আমি আপনার অফিসে আসছি, স্যার। আপনি এ রকম কেন শুরু করছেন?’
এরপর ইউএনও বলেন, ‘আপনাকে তো আমি চিনিই না। আপনার ছেলে কে? তাকেই তো চিনি না। আপনাকে সিনক্রিয়েট করতে পাঠায় দিল আর আপনি এসে নকশা করতেছেন এই জায়গায় এসে?’ ওই নারী বলেন, ‘আমি আপনার সাথে নকশা করব কেন, বলেন? আপনি আমার টাকাটা দিয়ে দেন, স্যার। আপনি আমাকে জেলে দেন, ফাঁসি দেন, যাই দেন, আমার টাকাটা লাগবে। আজকে আমি তিন দিন ধরে ঘুমাতে পারি না, আপনি টেনেসফার (বদলি) হবেন, তখন আপনাকে কোথায় পাব?’
লাইভে এ বিষয়ে কথা বলার পর ঊর্মি পাশের একজনকে বলছেন, ‘দেখত ভাইয়া, লাইভটা হইছে না? এখন কাটব কেমনে বলেন। আমি এখন ডিসির কাছে যাব।’
তবে তেঁতুলিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, গত সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ইউএনও খাবার খেতে উপজেলা পরিষদ-সংলগ্ন বাংলোতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন সামনে দাঁড়িয়ে ওই নারী ফেসবুক লাইভ করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন। এ ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা আগে থেকে ওই নারী উপজেলা পরিষদের কার্যালয় চত্বরে ঘোরাফেরা করছিলেন। তবে তার আগে তাকে ইউএনওর কাছে কেউ আসতে দেখেননি বলে উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান।
এ ঘটনার পর থেকে ওই নারী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দুই ছেলেও থাকেন না বাসায়। তবে ঊর্মি নামের ওই নারী যে জমিতে বসতি গড়েছেন, সেটিও পঞ্চগড় জেলা পরিষদের জায়গা। প্রায় ১০ বছর আগ থেকে তিনি সেখানে টিনের বেড়া দিয়ে ২২ ও ১৭ বছর বয়সী দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করছেন। এর আগে তিনি পঞ্চগড় জেলা শহরের রাজনগড় ও বোদায় উপজেলা শহরে বাসা নিয়ে ছিলেন।
যা বলছেন নারীর প্রতিবেশীরা
ঊর্মির তেঁতুলিয়ার বাসার প্রতিবেশীরা বলছেন, তার বড় ছেলে তো প্রাথমিকই পাস করেনি। ভালোমতো স্কুলে যায়নি। বর্তমানে মাদক সেবন ও ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত। তার গ্রাম পুলিশের চাকরি কীভাবে হবে। চাকরি করতে গেলে তো অন্তত এইট পাস করতে হবে। তার পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব না। তিনি কারও কাছে টাকা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন মনে হয়। তিনি কিছুদিন ধরে লোকজন নিয়ে ফেসবুকে ও টিকটকে ভিডিও বানান বলেও জানান তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঊর্মি দাবি করে মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার ছেলে সামান্য লেখাপড়া জানে। আমি গত ৬ মাস আগে ইউএনও স্যারকে গিয়ে বলছি যে আমরা তো অভাবী-গরিব মানুষ, স্যার। যদি একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেন, ভালো হয়। পরে তিনি গ্রাম পুলিশ (চৌকিদারের) চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ৫ লাখ চাইলেও পরে ৩ লাখ দিলেই হবে বলে জানান। পরে আমার মায়ের জমি বিক্রি করে ১ লাখ আর কিছু টাকা জোগাড় করে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। উনি ট্রান্সফার হবেন শুনে আমি ওখানে গেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ডিসি অফিসে একটা অভিযোগ দিয়েছি। মঙ্গলবার ডিসি অফিসে ডেকে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করছে। বর্তমানে আমি বাড়িতে যেতে পারছি না। এখন আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করাচ্ছেন ইউএনও স্যার। সোমবার সন্ধ্যার দিকে আমার ছোট ছেলেকে এবং আমি যার সাথে পেজের রিলের ড্যান্স করি, ওই লোককে নিয়ে যায় পরে। যদিও পরে তাদের ছেড়ে দিছে। আমার বিরুদ্ধে নাকি মামলা দিয়ে কী কী করবে। এ কারণে ভয়ে বাড়িতে যেতে পারছি না।’
ইউএনওর ক্ষোভ ও সিদ্ধান্ত
এদিকে এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তেঁতুলিয়া উপজেলার ইউএনও আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, ‘ওই নারীকে আমি কোনো দিন দেখিনি। তাকে চিনি না। তিনি জানেন না আমরা রুমে কয়টা চেয়ার, সোফা, টেবিল আছে। আবার দাবি করে কয়েকবার নাকি গেছে। তিনি ফেসবুক লাইভ করতে পারেন, অথচ কোনো প্রমাণ না রেখেই আমাকে টাকা দিয়ে চলে গেলেন? তিনি একজন টিকটকার, ভিডিও বানান। তিনি নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তার বড় ছেলে মাদকের সঙ্গে জড়িত। আমরা সবকিছু খুঁজে বের করছি। তাকে দিয়ে কেউ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করাচ্ছে। আমি যেহেতু কোনো অন্যায় করিনি, তাই এসব সহজেই খুঁজে বের করতে পারব।’
ইউএনও আরও বলেন, ‘এই নিয়োগের ভাইভায় জাতীয় সংগীত গাইতে না পারায় ৩৮ জনের কারোরই চাকরি হয়নি। সেখানে কেউ ঘুষের কথা বলেনি। আর তিনি তিন-চার মাস পর এসে এসব বলছেন। এত দিন যখন চাকরি হয়নি, তখন তো কিছু বলেননি। তাকে দিয়ে কারা কলকাঠি নাড়ছে, ইতোমধ্যে অনেক কিছু পেয়েছি। সবকিছু উদঘাটন করা হবে।’
জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, ওই নারী একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন। সেটি তদন্ত করা হয়েছে। তার অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে এটি সঠিক নয়। তবে আমরা সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখছি।