Image description

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে শুধু আরেকটি দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে দেখার সুযোগ খুব কম। ঢাকা ও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সফর অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির এক জটিল সমীকরণকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষ করে সফর শেষে দুই দেশের মধ্যে যৌথ ইশতেহার ঘোষণার সিদ্ধান্তই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবারের সফর শুধু প্রকল্প বা ঋণনির্ভর সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং দুই দেশের সম্পর্ককে একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করার প্রচেষ্টাও এতে থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২৬ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর এবং ২০০৫ সালে সম্পর্কের তিন দশক পূর্তিতে যৌথ ইশতেহার ঘোষণার পর এবার তৃতীয়বারের মতো এমন একটি দলিল প্রকাশ করতে যাচ্ছে দুই দেশ।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যৌথ ইশতেহার সাধারণত তখনই ঘোষণা করা হয়, যখন দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে একটি নতুন রাজনৈতিক বা কৌশলগত স্তরে উন্নীত করতে চায়। ফলে এ সিদ্ধান্ত সফরের গুরুত্বকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্যও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ সফর। ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি তার প্রথম চীন সফর। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সফরকালে তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির তিন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন—প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তিন স্তরের যোগাযোগের মাধ্যমে বেইজিং স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হচ্ছে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন। পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালীকরণ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রাজশাহীতে পানি শোধনাগার নির্মাণ এবং চারটি জাহাজ কেনার মতো প্রকল্প। পাশাপাশি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হবে।

দেশের জন্য এই অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত প্রায় দুই বছরে চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত অর্থায়নের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, অবকাঠামো বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার নতুন বিনিয়োগের উৎস খুঁজছে। ফলে চীনকে আবারও বড় অংশীদার হিসেবে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে ঢাকা।

তবে অর্থায়নই সফরের একমাত্র আলোচ্য নয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সফরের সময় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই উদ্যোগ ঘোষণা করেন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যে ৮০টির বেশি দেশ যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশকে গত কয়েক বছর ধরেই জিডিআইয়ে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিল চীন। তবে আগের সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এবার যদি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জিডিআইয়ে যুক্ত হয়, তাহলে প্রায় এক দশক পর চীনের কোনো বড় বৈশ্বিক উদ্যোগে অংশ নেবে দেশটি। এর আগে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যুক্ত হয়েছিল।

জিডিআইয়ে যোগদানের বিষয়টিকে অনেকে শুধু উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না। বরং এটিকে চীনের বৈশ্বিক কূটনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার একটি রাজনৈতিক সংকেত হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন জিডিআই, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই)-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি বিকল্প বৈশ্বিক নেতৃত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

এ কারণেই এবারের সফরকে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার সফর হিসেবে দেখা কঠিন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যে ১৫টির বেশি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও প্রটোকল সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর তালিকাও এই বাস্তবতার প্রতিফলন। উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, চীনা ভাষা শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কারিগরি শিক্ষা, গণমাধ্যম সহযোগিতা, বার্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়—এসব ক্ষেত্রের সহযোগিতা সম্পর্ককে বহুমাত্রিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

রাজনৈতিক দিক থেকেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতির খবর কূটনৈতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচিত। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সিপিসির যোগাযোগ নতুন নয়, তবে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যোগাযোগকে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা হয়।

ব্রেকিং নিউজ

 

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক এবং সিপিসির জাদুঘর পরিদর্শনের কর্মসূচিও সেই রাজনৈতিক বার্তাকে আরও স্পষ্ট করছে। জেনেভায় বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ সুফিউর রহমান যেমন বলেছেন, অতীতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অনেকাংশে প্রকল্পনির্ভর ছিল। কিন্তু টেকসই বন্ধুত্ব কেবল আর্থিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না; রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিনিয়োগ। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস হলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সম্ভাবনার পুরোটা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীনে রপ্তানি করে, বিপরীতে আমদানি করে ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ঢাকার লক্ষ্য চীনা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, শুল্কসংক্রান্ত বিরোধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। শ্রমনির্ভর শিল্পের একটি অংশ চীন থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি শিল্পাঞ্চল, অবকাঠামো ও নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে চীনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে ম্যানমেইড ফাইবার, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এগুলো সরাসরি রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে।

তবে অর্থনীতি ও রাজনীতির বাইরে সফরটির সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হচ্ছে ভূরাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরীয় প্রবেশাধিকার এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির কারণে এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিতে ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত হওয়াকে অনেকেই চীন-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক নির্ভরতা এবং নিরাপত্তাগত সম্পর্কও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

এই বাস্তবতায় বেইজিং সফর বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষাও। একদিকে চীনের অর্থ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং ভারত তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী।

বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই তিস্তা প্রকল্পের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে বাংলাদেশ সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। সফরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও বড় ধরনের অর্থায়ন চুক্তির বদলে সম্ভাব্যতা যাচাই ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রাখার সম্ভাবনাই বেশি। একইভাবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বা দ্বিতীয় যমুনা সেতুর মতো বড় প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কম।

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশের সামনে একই সঙ্গে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যৌথ ইশতেহার, জিডিআইয়ে সম্ভাব্য যোগদান, বহুমাত্রিক চুক্তি এবং শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ঢাকা ও বেইজিং সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় উন্নীত করতে চাইছে।

কিন্তু সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ হবে শুধু কতগুলো চুক্তি সই হলো বা কত বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল, তা দিয়ে নয়। বরং বাংলাদেশ কতটা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারল, কতটা প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করতে পারল এবং একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে পারল—সেটিই হবে এ সফরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।