Image description
 
 
[সবাই গরু ছাগল নিয়ে টানাটানিতে আছেন। খিচুড়ি খাওয়ার সময় খুব বেশি নাই। তাও দিলাম যাতে করে কোরবানীর সাথে সাথে আমরা অমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকেও স্মরণে রাখতে পারি। যে ভয়াবহ গণবিস্মৃতি আর আত্মপরিচয়ের সংকট আমাদের গ্রাস করে রেখেছিল দীর্ঘ অর্ধ-শতাব্দী জুলাইয়ের আত্মজাগরণ আবার আমাদের সুযোগ এনে দিয়েছে আমাদের সেই ঐতিহ্যকে বিপুল বিক্রমে পুনরায় জাগরিত করার। আমরা যেন কোনো তাবেদার শক্তির দ্বারা আর কখনোই আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত না হই, সেই কামনাই করি। সবাইকে ঈদ মোবারক।]
 
"... ঢাকায় মুসলিম সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল আযহা বা কোরবানী ঈদ। ঈদুল আযহার সময় ঢাকা শহর এক নতুন রূপ ধারণ করতো।
 
মোগল আমলে ঢাকায় কতটা জাঁকজমক সহকারে ঈদুল আযহা উদযাপন করা হত মীর্জা নাথানের বর্ণনা থেকে এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ তুলে ধরছিঃ
"উৎসবের দিনে বন্ধু জন, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীরা একে অন্যের নিকটে যেতেন এবং ঈদ উপলক্ষে তাদের অভিনন্দন জানাতো সেনাধ্যক্ষ সুজাত খান। এই আনন্দ উৎসবের দিনটিতে বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়নের নিমিত্তে একটি সামাজিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। ঈদ উপলক্ষে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে উপহার উপঢৌকন বিতরণ করা হত। ঈদুল আযহার উদযাপন বর্ণনা করে মীর্জা নাথান বলেন, সকলেই ঈদগায় গমন করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ইমাম খুৎবা পাঠ করেন। এই অর্থ দিয়ে বহু অভাবগ্রস্ত লোকের জীবন ধারণের সংস্থান হয় এবং তারা সুখী হয়। শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতি জ্ঞাপনের শব্দে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠে। বাড়ি প্রত্যাবর্তনের পর আমি কোরবানী করলাম। সুন্দর গায়িকা লাবণ্যময়ী নর্তকী ও মনোরম স্বভাবের গল্পকারদের নাচ, গান ও গল্পের মধ্যে দিয়ে সারাদিন ও সারারাত্রি ব্যাপী ভোজের আয়োজন হয়েছিল। কারখানার শ্রমিকদেরকে উপহার দেয়া হয়েছিল।"
 
ব্রিটিশ আমলে খ্রিষ্টানদের ক্রিসমাস উৎসব সরকারিভাবে জাঁকজমকসহকারে উদযাপন করা হত। তারপর দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছিল জাঁকালো এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, সরকারি ছুটির পরিমাণ ঈদ থেকেও পূজার জন্য বেশি ছিল। মুসলমান চাকুরিজীবীরা ঈদের ছুটি বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানালেও তাতে কর্ণপাত করা হয়নি। ব্রিটিশ শাসকরা মুসলমানদের ঈদ উৎসবকে গুরুত্ব দেয়নি।
ঈদ উৎসবকে আমরা শুধু ঘরে প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ রেখেছি। আমাদের উপর দিয়ে দুইশ' বছর কি বিপদের মধ্যেই অতিবাহিত হলো। নির্যাতন আর জুলুমে জীবন বাঁচানো যখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল তখন আনন্দ উৎসব করব কখন। দুইশ' বছর এদেশবাসী কান্নাকাটি করে কাটাল, এই সময় আমাদের জীবন যাত্রা থেকে স্বাচ্ছন্দ্য, উৎসব, অনুষ্ঠান জাঁকজমক কমে গেল। কিন্তু ধর্ম পরায়ণতা বৃদ্ধি পায়। এই জাতীয় সংকটের দিনে ঢাকাবাসী ঈদ উৎসবকে সীমিত করে নাই।
 
১৯৪৭ এর পূর্বে বাংলাদেশে ঢাকা শহরেই জাঁকজমকসহকারে ঈদ উৎসব পালন করা হতো। ঢাকা ছিল মোগল ও পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর। তাই মোগল ঈদের প্রভাব ছিল অধিক। এখানে নবাব, নায়েব নাজিম, জমিদার এবং শরীফ ব্যক্তিরা থাকতেন। মুসলমানেরা বিরাট আনন্দ উৎসব ও ভ্রাতৃসুলভ মনোভাবের ভিতর দিয়ে ব্রিটিশ আমলে ও ঢাকায় ঈদ উৎসব জাঁকজমকসহকারে উদযাপন করতেন। ইংরেজ আমলে এসেও ঢাকার ঈদের সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা গভীরে বিস্তার করেছিল তা এতে অনুমান করা যায়।
ব্রিটিশ আমলে সামাজিকভাবে ঈদ উৎসব পালন করা হত। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর খুব সমারোহের সঙ্গে প্রথম বছরে ঈদ উদযাপিত হল পাকিস্তানে। আশরাফ-উজ-জামানের দেয়া তথ্য জানা যায়:
“পূর্ব পাকিস্তানের চীফ মিনিস্টার খাজা নাজিমউদ্দীন নামাজ পালন করেছিলেন সকলের সঙ্গে। নামাজ শেষে ঢাকার পেশ ইমাম দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করলেন পাকিস্তানের স্বস্তি ও শুভ কামনা করে। ঈদ উৎসব সরকারিভাবে উদযাপিত হলো ঢাকায়। পূর্ব বাংলার ইংরেজ গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক বোন তার সরকারি বাসভবনে ঈদ পার্টির আয়োজন করে আমন্ত্রণ জানালেন বৈদেশিক কূটনীতিকদেরসহ ঢাকার সমস্ত অভিজনকে। করাচি থেকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঈদের মোবারক বাণী পাঠালেন পূর্ব পাকিস্তান বাসীদের। সরকারিভাবে সমর্থিত হয়ে গেল দেশে ঈদ পালন।"
ঢাকার সমাজ শুধু খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে ঈদের আনন্দকে সীমাবদ্ধ রাখে না। ঢাকার মানুষ উৎসব প্রিয়। পূর্বে উল্লেখ করেছি, বিভিন্ন উৎসবের জন্য এই শহরের খ্যাতি রয়েছে। কয়েকটি উৎসব ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ঈদ, মহররম ও জন্মাষ্টমী। এই তিনটি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মিছিল। ঢাকায় প্রাচীনকালে জাঁকজমক সহকারে ঈদ, মহররম ও জন্মাষ্টমী মিছিল উদযাপিত হতো। ঈদের মিছিল বা আনন্দ শোভাযাত্রা হল ঈদ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হত এ মিছিল।
এ মিছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গে কেবল ঢাকা শহরেই হত। অন্য কোথাও হত বলে জানা যায় না। রাজাবাদশাহদের বিক্রম প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে অনেক দেশেই মিছিল বা শোভাযাত্রার প্রচলন ছিল। মোগল সম্রাটদের আমলে দিল্লীতে ঈদের সময় ঈদ মিছিল বের করা হত। দিল্লীতে মোগল সম্রাট হুমায়ুন ঈদ সমারোহের আয়োজন করতেন। এতে তার সিপাহীরা নানারকম লক্ষ্যভেদের কলাকৌশল প্রদর্শন করতো। মোগল সম্রাটদের অভিষেক দিনে বণার্ঢ্য রাজকীয় মিছিল রাজধানী পথ অতিক্রম করত। ঈদের আনন্দ প্রকাশের অন্যতম প্রধান অংশ হচ্ছে ঈদের মিছিল। এসকল মিছিলে মোগল সম্রাটগণ কিংবা তার পরিবারের সদস্যগণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিল্পী ঈদের মিছিলের আনন্দদায়ক অনুভূতিকে নানাভাবে নানা বর্ণে ক্যানভাসে আবদ্ধ করতেন।
মোগল সুবেদারগণ ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকে ঈদ আনন্দ উৎসব উৎকর্ষ লাভ করে তা মীর্জা নাথানের বর্ণনায় পূর্বে উল্লেখ করেছি।
সুবেদার ইসলাম খাঁ যে সময় ঢাকা আগমন করেন তখন রমজান মাস ছিল। প্রথম বছরই ঈদের আনন্দ জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছিল। একদিকে রাজধানী স্থাপনের আনন্দ অপরদিকে ঈদের আনন্দ। ইতিহাস বিদদের ধারণা মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতী ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের সময় থেকেই ঈদের মিছিল বা আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু হয়েছিল। এ সম্পর্কে আশরাফ-উজ-জামান লিখেছেন : "ঢাকার মোগল শাসনকর্তা ইসলাম খানের আমল থেকেই ঢাকায় ঈদ উৎসবের পরিচয় পাওয়া যায়। খুব ধুমধাম করে ঈদ উৎসব পালিত হতো তখন। ইসলাম খাঁ নবনির্মিত লালবাগ মসজিদে গিয়ে নামাজে যোগ দিতেন। ঈদের মিছিল বের হতো। কেল্লা থেকে ঘোড়সওয়ার হয়ে বেরিয়ে আসতো ফৌজি বহর যোগ দিত এসে মিছিলে। হাতিশালা থেকে হাতির দল নিয়ে এসে নানারকম সাজে সেজে মাহুতরা যোগ দিত মিছিলে।"
নবাব সিরাজদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে পতনের পর ঢাকার নায়েব নাজিমরা (উপনবাব) কোম্পানী সরকারের অধীনে ঢাকার শাসক ছিলেন। ১৭৬৫ সালে ঢাকার নিমতলী নবাব প্রাসাদ নির্মিত হওয়ার পর নায়েব নাজিম (উপ নবাব) বড় কাটারা প্রাসাদ ছেড়ে এখানে বসবাস শুরু করেন। নিমতলী প্রাসাদ নির্মিত হওয়ার পর নায়েব নাজিমগণ সেখানে চলে যান। নিমতলী প্রাসাদে বসবাসকালীন সময়ে নায়েব নাজিমদের সময়েও অনুষ্ঠিত হয় ঈদের মিছিল।
নিমতলী প্রাসাদ থেকে এ মিছিল শুরু হয়ে তখনকার বড় বড় রাজপথ অতিক্রম করত। নায়েব নাজিমের ঈদ ও মহররম মিছিলে নবাব কাটারা, দেওয়ান বাজার, হোসেনী দালান, বকশী বাজার, বেগম বাজার, বেচারাম দেউরী, ছোট কাটারা, বড় কাটারা, চকবাজার, গিরদে উর্দু রোড এই সব মহল্লা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মিছিলের সামনের সারিতে নায়েব নাজিম নুসরাত জং হাতির পিঠে বসতেন। বরদার (বাহক) কৃত্রিম মুক্তা ও রৌপ্য তারের অলংকারযুক্ত শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক ছাতা তার উপরে তুলে ধরতেন। নানা রকম জরি আর লাল মখমল কাপড় দিয়ে হাতি সাজানো হত। আরও থাকত ঘোড়া, উট, পালকি, ঝিলিমিলি ঝিলিমিলি, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ সিল্কের শত শত নিশান মিছিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিত। নবাবদের সুসজ্জিত বাদ্যযন্ত্রের দল নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নিয়ে চলত। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে থাকত ঢোল, বাঁশি, কাড়া, নাকাড়া শিঙা। ঈদ মিছিলে হাতির পিঠে হাওদায় বসে অভিবাদন জানাতেন নায়েব নাজিম নুসরাত জং বাহাদুর। তার পেছনের হাতিতে থাকতেন নবাবের ছোট ভাই শামসুদ্দৌল্লা। ঈদের মিছিলে নায়েব নাজিমগণ নেতৃত্ব দিতেন। নবাবদের সঙ্গে হাতির পিঠে সাওয়ার হতেন ঢাকার জমিদার ও সম্মানীত ব্যক্তিবর্গ। নবাবদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন। ব্রিটিশের গোড়া পল্টন নবাবকে গার্ড অব অনার প্রদান করতেন। এ মিছিলে তৎকালীন বিদেশীরাও অংশগ্রহণ করতো। এ উপলক্ষে রাস্তায় দেখা যেত নানা রকম খেলা দেখানে ওয়ালা।
ঢাকার নবাবরা তাদের সৌখিনতা প্রভাব প্রতিপত্তি ও ঈদের আনন্দকে অতি জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করার জন্য মিছিলের ব্যবস্থা করতেন। আনন্দের রঙে রঙীন আর ঝলমল হয়ে উঠত ঈদের রাজকীয় মিছিল। হাতির পিঠে জমকালো হাওদায় সওয়ার হতেন নবাবি দরবারের রাজপুরুষেরা। মিছিলে শুধু রাজ দরবারের লোকজন অংশ নিতেন। সাধারণ মানুষ সেখানে দর্শক। রাস্তায় দু'ধারের এবং দালানের ছাদে দাঁড়িয়ে লোকজন তাকিয়ে দেখত এই দৃশ্য। মৃদু মৃদু হাসিতে মানুষকে সম্ভাষণ জানাতেন নবাব।
নবাবের হাতির পিছনে অশ্বারোহীর দল চলত রাজকীয় ব্যাণ্ডের তালে। সুসজ্জিত আরবীয় ঘোড়াগুলো যেন পা থামিয়ে রাখতে চাইতো না। ঢাকার পথ পরিক্রম করার জন্য উৎসাহী তারা কেশর হেলিয়ে দুলিয়ে টগবগ করে চলত। মিছিলের শান শওকাত দেখে লোক মুগ্ধ হত। রাস্তার পাশে বিভিন্ন দালান কোঠার ছাদে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখত নরনারী। আতর গোলাপ আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রসন্নতা ছড়িয়ে পড়ত বাতাসে। মিছিল দেখতে আগত লোকজন ছড়িয়ে দিত মুঠো মুঠো গোলাপের পাপড়ি। হাতির পিঠে উপবিষ্ট নবাবের চারপাশে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ত এগুলো। রাস্তার পাশে ভিক্ষুক হাত উঁচিয়ে ভিক্ষা চাইত। রাজপুরুষেরা পথে আশরাফী বিতরণ করতেন। সুসজ্জিত হাতির দলের শোভাযাত্রা আরো আকর্ষণীয়।
ঢাকার ঈদের মিছিল তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কিছুটা দুর্বল আকার ধারণ করলেও ঢাকাইয়ারা সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দেয়নি। মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আরম্ভ হয়েছিল। সে সময় থেকে ঈদ ঢাকা তথা বাংলাদেশে আরও বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে। তখন থেকেই ঢাকার নেতৃবৃন্দ ঈদ মিছিলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিল এই মিছিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অতীতের মিছিল ছিল রাজ-রাজরার ব্যাপার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীয়ান মুহাম্মদ সিদ্দীক খান ঈদ মিছিল সম্পর্কে জানিয়েছেন - "The Eid procession of Dacca. Which has been revived in its pristine glory Since the achievement of pakistan, also used to be a great day. This procession Continued unitl after the turbulent years of the 1920's when due to the fury of communal passions it had to be abandoned".
অর্থাৎ ঢাকার ঈদ মিছিল পুনরায় পূর্ব গৌরব নিয়ে পুরুজ্জীবিত হয়েছে। যেহেতু পাকিস্তানের অর্জন একটি মহান দিবস হিসেবে পরিগণিত। এই মিছিল ১৯২০ সালের দুর্যোগ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসাবে চালু ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হাঙ্গামায়, উপ্তত্ত পরিস্থিতির জন্য পরিত্যক্ত হয়ে গেল।
ব্রিটিশ আমলের শেষ অধ্যায়ে এসে মিছিলটি একটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। কবি বেনজীর আহমদ তিনি নিজে এ মিছিলে অংশ নিয়েছেন, তার দেয়া এক তথ্যে জানা যায়, মিছিলের উদ্যোক্তা ছিলেন হাকীম আরশাদ, কবি জাকারিয়া এবং জুম্মন বেপারী।
ঈদ মিছিলের পুনরায় প্রচলন হয় বৃটিশ আমলের শেষ অধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকে। শহরের এ সকল গণ্যমান্য ব্যক্তি ছাড়াও তখনকার আহসান মঞ্জিলের নবাব পরিবার অর্থ ও সাহস দিয়ে ঈদ মিছিলে সহযোগিতা করতেন। নবাব বাড়ির খাজা শাহাবুদ্দীন ও খাজা ইসমাইল সাহেবও মিছিলে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। জুম্মন বেপারী, কাদের সরদার, আবদুল আজিজ মিছিলের অগ্রভাগে কোন কোন বছর থাকতেন। নবাব হাবিবুল্লাহ ঢাকায় থাকলে তিনিও মিছিলকারীদের উৎসাহিত করতেন। মিছিলে থাকত কাশিদা পার্টির দলসমূহ। ঈদ মিছিলের তখনকার দিনে আকর্ষণ ছিল, মোটর গাড়ি। সেগুলি ছিল তখন নতুন। মোমিন মটর কোম্পানীর বাস ও ট্রাকগুলোকে ময়ূর, প্লেন, নৌকা, জাহাজ, বিভিন্নভাবে সাজিয়ে বের করা হত। হাকীম হাবিবুর রহমান বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তার শৈশবে দেখা ঈদ মিছিলের বিবরণ দিয়েছেন এভাবেঃ
“ঈদের দ্বিতীয় দিন এই মিছিল বের করা হতো। প্রথমত এই প্রশেসান (মিছিল) সাদাসিধেভাবে বের করা হতো। কিন্তু বর্তমানে রোজার সেহরীতে জাগানোওয়ালারাও অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে। এইভাবে এই প্রশেসান বর্তমানে জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে গেছে। যার বড় বড় সদস্য শহরের বাস এবং মটর গাড়ির মালিক। এই মিছিল চকবাজার থেকে শুরু হয়ে ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, নবাবপুর, বংশাল হয়ে পুনরায় চকে এসে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। এই মিছিলের গানও সবই উর্দুতে গাওয়া হতো এবং সম্পূর্ণত মুসলমানরাই এতে অংশ নিত”।
ঈদের মিছিলকে কেন্দ্র করে একটি আত্মীয়তার বন্ধন নির্মিত হত। এ আত্মীয়তা শুধুমাত্র আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আত্মীয়তা নয়, এ আত্মীয়তা হচ্ছে সকলের মধ্যে আত্মীয়তা। মহিলারা বিভিন্ন মহল্লা থেকে আসতেন মিছিল দেখার জন্য। ছাদের উপর কাপড় দিয়ে পর্দা ঘেরাও করে দেওয়া হত। যাতে বেপর্দা না হন। পর্দার আড়াল থেকে তারা মিছিল দেখতেন।
বিভিন্ন এলাকার যুব সম্প্রদায় শরবতের গাড়ি নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করত এবং মিছিল চলকালীন সময়ে মিছিলকারীদের শরবত পান করনো হত। এ. শরবত নিয়ে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা ছিল। ভাল শরবত পানাহারকারীকে পুরস্কৃত করা হত।
এ মিছিলে একাধিক হাতি সুন্দর সাজে সাজিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। সুশোভিত হাতি মিছিলের সৌন্দর্য ও জৌলুস বৃদ্ধি করত। হাতিগুলিকে সুন্দর সাজে সাজিয়ে রাজপথের উপর দিয়ে সারি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হত। হাতির সংখ্যা যে বছর কম দেখা যেত, সে বছর ট্রাক দেখা যেত বেশি। হাতি ঢাকার বর্মী জমিদার বাড়ি, নেত্রকোণা জমিদার বাড়ি থেকে আনা হত।
বেনজীর আহমেদের বিবরণ থেকে জানা যায়, এ মিছিলে উন্নতমানের কয়েকটি রেসের ঘোড়া সুন্দর সাজে সাজিয়ে আনা হত। মিছিল চলাকালীন সময়ে এ ঘোড়াগুলো বাদ্যের তালে তালে ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যেতো আর বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নাচ দেখিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতো।
সাধারণত তিরিশ বা চল্লিশের দশকের নানা রকম উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাকের ওপর সুন্দর মঞ্চ বানানো হত এবং তরুণ সম্প্রদায় বিচিত্র ধরনের পোশাক-পরিচ্ছদ পরে অভিনয়ের মাধ্যমে একেকটি ঘটনা তুলে ধরত। সামাজিক এবং ঢাকার নগর জীবনের সমস্যা নিয়ে অভিনয়ের ব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন ধরনের সঙ সাজিয়ে গরুর গাড়িতে নিয়ে যাওয়া হত। বিভিন্ন মহল্লা থেকে আগত সঙয়ের দল গান বাজনা ও হাস্যকৌতুক করে মানুষকে আনন্দ দিত। নাটকীয় ভাব প্রকাশের সর্বোউৎকৃষ্ট ও সার্বজনীন মাধ্যম হল সঙ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা উৎসবের সময় সঙ আত্মপ্রকাশ করত। মুখ্যত মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য সঙ সৃষ্টি হয়েছিল। ঈদের মিছিল হল সমাজের দর্পণ তাই সঙয়ের মুখ দিয়ে নানা ভুল ভ্রান্তির ও ব্যঙ্গ বিদ্রূপের কথা বলানো হত। দশের সামনে দেখানো হত বিভিন্ন সামাজিক চিত্র।
একটি মর্মান্তিক ঘটনা যা তখনকার ঈদ মিছিলের দুঃসংবাদ বয়ে আনে ভারত বিভাগের পূর্বে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখনকার একটি ঈদের মিছিল যখন নবাবপুর রোডের ভিতর প্রবেশ করে, তখন নবাবপুরের রাস্তায় দু'দিকের হিন্দু ভবনগুলো থেকে ইষ্টক বৃষ্টি, পাটা-পুতা, চৌকি, বাড়ির ভারী আসবাবপত্র মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের উপর বর্ষিত হওয়ার ফলে বহু মুসলমান যুব বৃদ্ধা আহত হয়েছিল। সে এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। নবাবপুরে তখন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বাসস্থান ছিলো।
১৯৫২ সালের ঈদ মিছিলের বিবরণ পাই দৈনিক আজাদে। বিস্তারিত সে সংবাদটি উদ্ধৃত করছি।
“ঢাকায় ঈদের মিছিল (ষ্টাফ রিপোর্টার) প্রত্যেক বৎসরের ন্যায় এবারও ঈদের পর দিন ঢাকায় মিছিল বাহির হয়। এ বৎসরের মত এরূপ বিরাট মিছিল ইতিপূর্বে আর কখনও দৃষ্টিগোচর হয় নাই। প্রায় লক্ষাধিক শহরবাসী এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। মিছিলের পুরোভাগে দুইটি সুসজ্জিত হস্তীসহ বিভিন্ন মহরা ও ক্লাবের এক একটি আখড়া বাহির হয়। এই সমস্ত আখড়ার মারফত বিচিত্র সাজসজ্জা দ্বারা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ও শহরের চাল-চলন প্রভৃতির তীব্র সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করা হয়। তন্মধ্যে আল-হেলাল ক্লাব কর্তৃক কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘের গড়িমসি, রহমতগঞ্জ মহল্লা কর্তৃক কাশ্মীরের ভারতীয় জুলুমের দৃশ্য ব্যঙ্গ করে দেখান হয়। এতদ্ব্যতীত বিভিন্ন আখড়ার মারফত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির অকর্মণ্যতা এবং সরকারী কর্মচারীদের দুর্নীতি, চোরাকারবারী, অভিজাত সম্প্রদায়ের অতি আধুনিকতা প্রভৃতিও তীব্র সমালোচনা করা হয়। 'আজাদ কাশ্মীর জিন্দাবাদ', 'কাশ্মীর আমাদের' প্রভৃতি জাতীয় বিভিন্ন দাবিদাওয়া সম্বলিত প্লাকার্ডও এই মিছিলে স্থান পায়। প্রায় এক মাইল দীর্ঘ এই মিছিলটি সাড়ে তিন ঘণ্টা যাবৎ শহরের বড় বড় রাস্তাগুলি পরিভ্রমণ করে। মিছিলটি যাহাতে সুষ্ঠুভাবে ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, তজ্জন্য মিছিলের সঙ্গে বহু পুলিশ দেওয়া হইয়াছিল।"
১৯৫৩ সালের ঈদ মিছিলের সংবাদটিও দৈনিক আজাদ থেকে তুলে ধরছি।
“বিপুল সমারোহের সহিত ঢাকায় ঈদ উদযাপিত (ষ্টাফ রিপোর্টার) : ঈদের পর দিবস ঢাকার প্রসিদ্ধ ঈদের মিছিলটী খুবই আকর্ষণীয় হয়। এই মিছিল দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ নাগরিক নওয়াবপুর রোড, জনসন রোড, সদরঘাট অঞ্চলে বেলা প্রায় ১২টা হইতে অপেক্ষা করিতে থাকে। শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও সর্দারগণের উদ্যোগে এই মিছিল বাহির করা হয়।
সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি, ভিসা অফিসের দুর্নীতি, ঔষধ বিক্রেতাগণ কর্তৃক চড়া মূল্যে ঔষধ বিক্রয়ের কারসাজি, প্রদেশের খাদ্য সমস্যা, চাষীগণের দুরবস্থা, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান, ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির রাস্তার দুর্দশা ও তাহার প্রতিকার প্রভৃতি বিষয়ের বাঙ্গ রূপ দিয়া জনসাধারণের নিকট আকর্ষণীয়ভাবে তুলিয়া ধরা হয়। গতকল্য (সোমবার) পল্টন ময়দানে ঈদ উপলক্ষে এক বিরাট মেলা হয়।"
যুগের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঈদ মিছিলের বিবর্তন দেখা যায়। রাজকীয় শান শওকত লুপ্ত হয়ে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের কথা মিছিলে প্রাধান্য পেতে থাকে পরবর্তীতে দেখা যায় ঈদ মিছিল হয়ে উঠেছে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদের প্রতীক। কালের করাল গ্রাসে ঈদ মিছিল তাই বাধা প্রাপ্ত হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও রাজনীতি, আদমজী রায়ট, মহল্লায় মহল্লায় দ্বন্দ্ব, ভায়াবহ বন্যা প্রভৃতি কারণে শান্তি ভংগের আশংকায় ১৯৫৪ সালের ৫ই জুন ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঈদ মিছিলে বন্ধ করে দেন। তারপরও কোন কোন বছর খণ্ড খণ্ড মিছিল হয়েছে বলে জানা যায়।
ঈদ মিছিল যারা তখন উপভোগ করেছেন, এখনও সেসব বয়স্ক ব্যক্তি হাসি আনন্দের কথা ভুলতে পারেন না। এই মিছিল দেখার জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন ঢাকায় আসত। মিছিলে যেমন হাসি আনন্দ থাকত, তেমনি থাকত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের অর্থবহ দিকের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। মানুষ তখন অনাবিল ও অনাড়ম্বর হাসি আনন্দে মেতে উঠত॥" (সংক্ষেপিত)
— রফিকুল ইসলাম রফিক / যুগে যুগে ঢাকার ঈদ মিছিল ॥ [রিদম প্রকাশনা সংস্থা - জানুয়ারি, ২০০৪ । পৃ: ৩৭-৮৪]
 
 
 
May be an image of crowd, temple and text