Image description

ছোটবেলায় তো ঈদ করতাম গ্রামে গিয়ে। কোরবানির ঈদ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক উৎসব—যেখানে গ্রামের বাড়ি, একান্নবর্তী পরিবার, গরুর হাট, পুকুরে মাছ ধরা আর সারাদিনের মিলনমেলা মিলিয়ে তৈরি হতো অন্যরকম আবহ।

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হারালা গ্রাম। সেখানেই ছড়ানো ছিল পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। নানা, দাদি, ফুফু, চাচা, মামা—সবাই মিলে এক বিশাল যৌথ পরিবার। বাড়িটি এলাকায় পরিচিত ছিল ‘সওদাগর বাড়ি’ নামে। ব্রিটিশ আমলে পরিবারের ব্যবসার সূত্র ধরেই এই নামের প্রচলন হয়েছিল।

গ্রামের সেই ঈদের আনন্দ শুরু হতো ঈদেরও বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। ঈদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথাগুলো জাগো নিউজকে বলছিলেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, যিনি তার কর্মজীবন শেষ করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ হিসেবে।

 

চিরচেনা কোলাকুলি এখন ভার্চুয়াল কোলাকুলি

ড. জাহিদ হোসেন বলছিলেন, ‘আমরা ঈদের আগে আগেই গ্রামে চলে যেতাম। কোরবানির ঈদ হলে তো কথাই নেই, উন্মুখ হয়ে থাকতাম কবে হাটে যাব। ছোটরা সবাই মিলে চাচা, বাবা কিংবা মামাদের হাত ধরে হাটে যেতাম। নিজের পছন্দের গরুটা কিনে ধুলো উড়িয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি নিয়ে আসাটাই ছিল আমাদের কাছে এক মহাউৎসব।’

‘সেই রূপসী বাংলার ঈদ যেন জড়িয়ে ছিল অজস্র ছোট ছোট উদযাপনে। বাড়ির সামনে বিশাল উঠান, পাশেই টলটলে জলের পুকুর। ঈদের আগের দিন ভোরে সেই পুকুরে জেলেরা বিশাল জাল ফেলতেন মাছ ধরার জন্য। রুপালি মাছের ছটফটানি আর গ্রামের মানুষের ভিড় মিলে তৈরি হতো এক অভাবনীয় দৃশ্য।’

 

‘আসলে ঈদ আসার আগেই আমাদের দুটো উৎসব হয়ে যেত’,— মৃদু হেসে বলেন ড. জাহিদ হোসেন। ‘একটা গরুর হাট, আরেকটা পুকুরে জাল টেনে মাছ ধরা।’

ড. জাহিদ হোসেন বলছিলেন, ঈদের সকালের আবহটাও ছিল অদ্ভুত এক পবিত্রতায় মোড়ানো। নতুন জামা পরে বড়দের সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। নামাজ শেষে শুরু হতো কোরবানির ব্যস্ততা। গরু জবাই, মাংস কাটা, ভাগ করা—সবকিছুতেই আনন্দের সঙ্গে হাত লাগাত পরিবারের ছোট-বড় সবাই।

এরপর চটের বস্তা বা গামলায় করে পাড়া-প্রতিবেশী আর দুস্থ মানুষের ঘরে ঘরে মাংস পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ত ছোটদের ওপর। সেই ক্লান্তিতেও কী ভীষণ তৃপ্তি ছিল!
দুপুরে ম-ম করা সুগন্ধি পোলাও আর মাটির চুলার টাটকা গরুর মাংসের ভোজ শেষে শুরু হতো আসল আনন্দ—মানুষের মেলা।

তখন ঈদ মানেই ছিল সবাইকে নিয়ে থাকা। চাচাতো ভাই, মামাতো ভাই, খালাতো ভাই—সবাই মিলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একসঙ্গে সময় কাটানো। এখন সেই বড় পরিসরের সামাজিকতা আর নেই। সেটিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

সকালে এক বাড়িতে সেমাই-জর্দা খাওয়া, দুপুরে আরেক বাড়িতে ভুরিভোজ, বিকেলে অন্য কারও উঠানে বসে চা—এইভাবেই কেটে যেত পুরোটা দিন।

চাচাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোনরা মিলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হুল্লোড়, আড্ডা আর লুকোচুরি... ক্লান্তি কাকে বলে আমরা জানতামই না।

চিরচেনা কোলাকুলি এখন ভার্চুয়াল কোলাকুলিবিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, ছবি: সংগৃহীত

আজকের ঈদের সঙ্গে সেই সোনালি অতীতের পার্থক্য ড. জাহিদ হোসেন স্পষ্ট দেখতে পান… সামাজিকতায়, উৎসবের ধরণে ও আতিথেয়তায়।

এখন আর ওইভাবে দল বেঁধে গ্রামে গিয়ে ঈদ করা হয় না। পরিবারগুলো সব ছোট, একক হয়ে গেছে। আগে যেখানে ‘বৃহৎ পরিবার’ একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতো, এখন তা কেবল নিজের ভাই-বোন আর তাদের সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বলে জানান জাহিদ হোসেন।

তবে তিনি একে সম্পর্কের নৈতিক অবনতি বলতে রাজি নন। তার মতে, সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে সম্পর্কের ধরনটা বদলে গেছে মাত্র।

‘টানটা কিন্তু এখনও আছে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে মানুষ এখনও ছুটে যায়। কিন্তু একসঙ্গে অলস দুপুরে বসে গল্প করা, উঠানে মাদুর পেতে গোল হয়ে বসা—এই দৃশ্যগুলো বড্ড চড়া মূল্যে হারিয়ে গেছে।’

এই রূপান্তরের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা আর সময়ের গতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখেন এই অর্থনীতিবিদ।

একসময় ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি ফেরাটা ছিল যেন এক অলিখিত সামাজিক দায়বদ্ধতা। কর্মস্থল বা পড়াশোনার জন্য শহরে থাকলেও ঈদের সময় নাড়ির টানে ফিরতেই হতো। কিন্তু এখন বিশ্বায়নের যুগ। উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা জীবিকার তাগিদে পরিবারের সদস্যরা আজ পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন।

প্রযুক্তি এখন ঈদের চিরচেনা কোলাকুলির গায়ে ‘ভার্চুয়াল’ তকমা এঁটে দিয়েছে। ড. জাহিদ হোসেনের গভীর পর্যবেক্ষণ, এখনকার তরুণ প্রজন্মের ঈদ মূলত পাঁচ ইঞ্চি পর্দার মোবাইল নির্ভর।

“ডাইনিং টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে ঠিকই, কিন্তু দেখা যাবে এক হাতে চামচ, অন্য হাতে ফোন চলছে। ভিডিও কলে ‘ঈদ মোবারক’ বলা হচ্ছে, স্ক্রিনেই চলছে ভার্চুয়াল কোলাকুলি।”

চিরচেনা কোলাকুলি এখন ভার্চুয়াল কোলাকুলিবিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বাস্তবের চেনা মানুষের চেনা স্পর্শ আর এই ডিজিটাল শুভেচ্ছার মধ্যে কিছুটা হলেও আবেগের দূরত্ব রয়েছে।

আগে ঈদের বিকেলে বাড়ির উঠানে সবাই গোল হয়ে বসত। কেউ মাটিতে, কেউ মোড়ায়, কেউবা কাঠের চেয়ারে। মনখোলা হাসির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠত। মুখোমুখি বসে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার যে পরম আত্মিক সংযোগ, ডিজিটাল দুনিয়া তা দিতে পারছে কিনা সেটা একটা বড় প্রশ্ন…।’

এমনকি ঈদুল আজহার মূল চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের জায়গাতেও পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন জাহিদ হোসেন।

শৈশবে নিজ হাতে মাংস বিলানোর মধ্যে যে পরম আনন্দ আর মানবিক বোধ তৈরি হতো, এখনকার শহরের চার দেওয়ালে বড় হওয়া শিশুরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে দূরে।
আবার নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাণী অধিকার বা নৈতিকতার আলোকেও কোরবানিকে ভিন্ন চোখে দেখে।

জাহিদ হোসেনের ভাষায়, ‘এখনকার অনেক সন্তান কোরবানি সামনাসামনি দেখতেই পারে না, ভয় পায়। আবার কেউ কেউ এখনও পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়—নিজে হাটে যায়, নিজে তদারকি করে। দুই চাকার দুই রকম স্রোত এখন দৃশ্যমান।’

তবুও এই পরিবর্তনকে তিনি সময়ের অমোঘ নিয়ম বলেই মেনে নেন। গ্রাম বদলেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। ফলে ঈদের বাহ্যিক রূপ বদলাবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ঈদের মূল সম্প্রীতির চেতনাটুকু হয়তো কোনো না কোনোভাবে বেঁচে থাকবে। হয়তো এখন আর হাটে যাওয়ার ধুলোমাখা স্মৃতি তৈরি হয় না, বদলে তৈরি হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রঙিন ছবি।

হয়তো সশরীরে আড্ডা জমে না, কিন্তু দূর প্রবাস থেকে হৃদয়ের ভেতরের টানটুকু ঠিকই প্রকাশ পায় মেসেজের শব্দে। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের উৎসবের আকুতিটুকু ফুরিয়ে যায়নি।

চিরচেনা কোলাকুলি এখন ভার্চুয়াল কোলাকুলিবিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন, ছবি: সংগৃহীত

তবুও, সমস্ত পরিবর্তনের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই মন্থর, মায়াময়, মানুষে মানুষে মিশে থাকা চিরায়ত ঈদ। জায়গা করে নিয়েছে গতিময় জীবন।

যে ঈদে গ্রামের মেঠোপথে জোনাকির আলো নামার সঙ্গে সঙ্গে উঠানগুলো মুখর হতো মানুষের কলকাকলিতে। যে ঈদে সম্পর্কগুলো মাপা হতো না কোনো যান্ত্রিক স্ক্রিনে; বরং মাপা হতো উষ্ণ আলিঙ্গনে, মুখোমুখি বসে থাকা ভালোবাসায়।

আর সেই ফেলে আসা সোনালি দিনগুলোর স্মৃতিই আজও চন্দনাইশের হারালা গ্রামের জাহিদ হোসেনের কণ্ঠে ভরিয়ে দেয় এক নরম, ধীর আর কিছুটা আবেগী নস্টালজিয়া।