চট্টগ্রামে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সেতুর পিলার থেকে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে রবিবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার দিনভর বেশ উত্তেজনা ছিল। পিলার থেকে এসব গ্রাফিতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে মুছে সেখানে বিলবোর্ড ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে– এমন অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। বিষয়টি নিয়ে সোমবার পৃথক সংবাদ সম্মেলনও করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং এনসিপি নেতৃবৃন্দ।
যেভাবে সূত্রপাত
চট্টগ্রাম নগরীর শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সেতুর ওয়াসা মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত পিলারে আঁকা জুলাইয়ের গ্রাফিতি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি মুছে ফেলা হয়। এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলার স্থানে লেখা হয় বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়া হবে। বিষয়টি এনসিপির নেতৃবৃন্দের নজরে আসার পর রবিবার (১৭ মে) সন্ধ্যায় ওইসব পিলারে পুনরায় গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচি দেন তারা। এসব গ্রাফিতি চসিক মেয়র ডা. শাহাদাতের নির্দেশে মুছে ফেলা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
রাতে বেশ কয়েকটি পিলারে এনসিপি নেতৃবৃন্দ গ্রাফিতি অঙ্কন করেন। কয়েকটি পিলারে ‘শাহাদাত জুলাইয়ের গাদ্দার’সহ বিভিন্ন কথা লেখেন। এরপর ছাত্রদলসহ বিএনপির স্থানীয় নেতারা এসে তার এর প্রতিবাদ করে বিক্ষোভ করেন। এরপর লেখাগুলো বিএনপি-ছাত্রদলের লোকজন মুছে দেন। এই নিয়ে দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে থাকে। উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডাও হয়। চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। পরে পুলিশ এসে দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করে। এরমধ্যে এনসিপি মিছিল নিয়ে নিউমার্কেটের দিকে চলে যায়। বিএনপি-ছাত্রদল মিছিল নিয়ে ওয়াসার দিকে চলে যায়।
জনসমাবেশ ও মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি
সোমবার (১৮ মে) সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জিইসি মোড় থেকে দেওয়ান হাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তার জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৮-এর ৩০ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে পুলিশ কমিশনার সিএমপি ওই স্থানে যেকোনও ধরনের জনসমাবেশ ও মিছিল-মিটিং ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি
জনসমাবেশ এবং মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণার মধ্যে সোমবার দুপুরে গ্রাফিতি আঁকতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার দুপুরে নগরীর টাইগার পাস মোড়ে কিছু শিক্ষার্থী জুলাইয়ের গ্রাফিতি আঁকার জন্য জড়ো হন। পরে পুলিশ বাধা দিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এমনকি নারী শিক্ষার্থীদের পুলিশ মারধর করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন এনসিপি নেতৃবৃন্দ। পুলিশ একপর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকে তিন জনকে আটক করে ভ্যানে তোলে। পরে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা সরে যান।
পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন
গ্রাফিতি মুছে ফেলা এবং রবিবার রাতে বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এনসিপির বাকবিতণ্ডার জেরে পাল্টা-পাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছেন এনসিপি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র। নগরীর ষোলশহর বিপ্লব উদ্যানে এনসিপির সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকে দায়ী করে বলেন, ‘গ্রাফিতির স্থান বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া দেওয়ার জন্য মুছে ফেলা হয়েছে।’ অপরদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশনা তিনি দেননি। চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে পিলার থেকে পোস্টার সরিয়ে রঙ করেছে। এর জন্য তিনি দায়ী নন বলেও দাবি করেন।
আবারও গ্রাফিতি অঙ্কন
সোমবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে আবারও গ্রাফিতি আঁকা কর্মসূচি শুরু করেছে এনসিপি। নগরীর টাইগারপাস এলাকা থেকে উড়াল সেতুর পিলার, দেওয়ালে এ গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। এনসিপি নেতৃবন্দ বলেন, ‘গ্রাফিতি আঁকা কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামজুড়ে চলবে।’
সিএমপি কমিশনারের জারি করা এ গণবিজ্ঞপ্তি প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক এবং মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিএমপি কমিশনারের এ গণবিজ্ঞপ্তি হাসিনা স্টাইলের। হাসিনাও ছাত্র-জনতাকে এভাবে প্রশাসনকে দিয়ে দমন করতে চেয়েছিল। বিএনপিও একই কায়দায় প্রশাসনকে দিয়ে দমন করতে এ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে।
এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরীর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়ইব বলেন, ‘চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারের পিলারে আঁকা জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলো কেন মুছে দিয়েছেন সেটি আমাদের বোধগম্য নয়। এসব গ্রাফিতি মুছে তিনি ক্ষান্ত হননি। সেখানে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে বলে তিনি সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন। ইস্পানি মোড় থেকে টাইগারপাস মোড় পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে বলে সেখানে রেস্ট্রিকটেড করে ফেললেন।’
সংগঠনটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, ‘চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারের পিলারের প্রায় সবগুলোর গ্রাফিতি মেয়র শাহাদাত যখন মুছে দিয়ে সেখানে বিজ্ঞাপনের জন্য ভাড়া হবে বলে প্রচার করেন, তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিক্রিয়া জানাই। পরে আমরা সেখানে পুনরায় গ্রাফিতি অঙ্কন করতে গেলাম, তখন শাহাদাত ভাই পুলিশ পাঠিয়ে, দলীয় গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ সোমবার দুপুরে একদল শিক্ষার্থী গ্রাফিতি অঙ্কন করার সময় পুলিশ জুলাইয়ে সম্মুখসারির নারীযোদ্ধাদের গায়ে হাত দিয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দিলে কী হয় পুলিশ জুলাই থেকে শিক্ষা নেয়নি।’
এ বিষয়ে এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় বলেন, ‘আজকে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে তার অবদান জুলাইযোদ্ধাদের। আজ সন্ধ্যা ৭টায় নগরীর টাইগারপাস থেকে নতুন করে জুলাইয়ের গ্রাফিতি আঁকা শুরু হয়েছে। এই কর্মসূচি পুরো নগরজুড়ে চলবে। পুরো নগরীকে আবার জুলাইয়ের গ্রাফিতিতে সাঁজিয়ে দেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য আমি কখনও কোনও নির্দেশ দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেবো না। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার ব্যানার অপসারণ ও রঙ করার কাজ করে থাকে। টাইগারপাসসহ যেসব স্থানে রঙ করা হয়েছে, সেখানে মূলত পোস্টার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং দৃশ্যমান কোনও গ্রাফিতি ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল। কেউ গ্রাফিতি করতে চাইলে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শৈল্পিক ও মানসম্মত গ্রাফিতি আঁকতে পারেন। এ ধরনের উদ্যোগে আমি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করবো।’