Image description

তুচ্ছ কারণে পারিবারিক নৃশংসতা বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটছে একের পর এক পারিবারিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। কখনো মা তাদের সন্তানদের হত্যা করছেন। পরে নিজেও আত্মহত্যা করছেন। আবার কখনো স্বামী তার স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করছেন। কখনো কখনো একজন ঘাতকের হাতে একজন থেকে শুরু করে পাঁচজনও হত্যার শিকার হচ্ছেন। এভাবেই স্বজনরা ঘাতক হয়ে স্বজনদের হত্যা করছে। কিন্তু একেবারে তুচ্ছ কারণে স্বজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিজের বাবার কাছে সন্তানরাও নিরাপদ না। স্ত্রী-স্বামীর কাছে এবং স্বামী-স্ত্রীর কাছে নিরাপদ নন। তুচ্ছ পারিবারিক দ্বন্দ্বগুলো এতটা চরম পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে মানুষ নৃশংস হয়ে উঠছে।

গতকাল মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকায় নৃশংস ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেখানকার একটি বাসা থেকে চিন্ময় দাস (৪০), তার স্ত্রী ইশা দাস (২৫) ও তাদের আট মাসের শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ইতালি প্রবাসী যতীন বাড়ৈর স্ত্রী মিষ্টি বাড়ৈর বাসায় আসেন আত্মীয় চিন্ময় দাসের পরিবার। রাতে খাবার খেয়ে চিন্ময় তার পরিবার নিয়ে ওই বাসার একটি কক্ষে ছিলেন। মধ্যরাতে চিন্ময় ও তার স্ত্রীর মধ্যে হট্টগোল টের পেয়ে রাত তিনটার দিকে মিষ্টি বাড়ৈ সদর মডেল থানার পুলিশকে কল করেন।

পুলিশ ওই বাসায় গিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের লাশ উদ্ধার করে। মাদারীপুর সদর মডেল থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, আমিরাবাদ এলাকার মৃত বীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী শান্তনা রানী চন্দের বাসায় ৩ বছর ধরে ভাড়া থাকেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার সাতপাড় এলাকার মিষ্টি বাড়ৈ। রোববার বিকালে চাচাতো ভাই পরিচয় দিয়ে ওই বাড়িতে আসেন চিন্ময় দাসসহ পরিবারের তিন সদস্য। মধ্যরাতে খবর পেয়ে ঘরের দরজা ভেঙে শিশুসহ তিনজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওসি জানান, পাশের রুমে একা ছিলেন মিষ্টি বাড়ৈ। পরে মিষ্টির কল পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে মিষ্টিকে।

এর আগে গত ৮ই মে রাতে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ঘটে হৃদয়বিদারক ঘটনা। একটি ভাড়া বাসার মেঝেতে পড়েছিল তিন মেয়ে শিশুর নিথর দেহ। বিছানার উপর আরেক যুবকের মরদেহ। আর জানালার পাশে হাত-মুখ বাঁধা নারীর নিথর দেহ। তাদের সবারই গলাকাটা। কোনো দাগী সন্ত্রাসী বা অপরাধীর হাতে তারা খুন হননি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদেরই এক স্বজন। ঘাতক প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া নিহত ওই শিশুদের বাবা, নিহত নারীর স্বামী ও যুবকের ভগ্নিপতি। অবশ্য পরে ঘাতক ফোরকান মিয়াও আত্মহত্যা করেছেন। তবে কেন এই হত্যাকাণ্ড। কেন ফোরকান এতটা নৃশংস হয়ে নিজের তিন অবুঝ শিশু, স্ত্রী ও শ্যালককে হত্যা করেছেন? ঘটনাস্থল থেকে একটি কম্পিউটারে টাইপ করা অভিযোগপত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ, যা গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসির উদ্দেশ্যে লেখা ছিল। ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, স্ত্রী শারমিন স্বামীর উপার্জিত প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে বাবার বাড়িতে জমি কিনেছেন এবং খালাতো ভাই রাজুর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তাদের সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে। এ ছাড়া গত ৫ই মে শারমিন ও তার কথিত প্রেমিক রাজু ফোরকানকে মারধর করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। হত্যার পর ফোরকান তার ভাইকে ফোনে বিষয়টি জানান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তার শ্বশুর শাহাবুদ্দিন মামলা দায়ের করলে পুলিশের একাধিক টিম ফোরকানকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ট্র্যাকিং ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১ই মে সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে ফোরকান পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন। ১৬ই মে বিকালে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ঘোড়াদৌড় বাজারসংলগ্ন পদ্মা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে মাওয়া নৌ-পুলিশ।

২০২৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের ভূঁইয়াপাড়ার একটি ফ্ল্যাটে মো. হাবিবল্লাহ শিপলু (৩৫), তার স্ত্রী মোহিনী আক্তার মীম (২৪) ও তাদের সন্তান আফরানের (৪) লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, নিহত শিপুলের মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল। অন্য একটি ঘরে খাটের উপর তার স্ত্রী ও সন্তান মরদেহ পাওয়া যায়। স্ত্রী-সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালের ১৪ই জুলাই ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় ময়না বেগম (২৫), তার সাত বছর বয়সী মেয়ে রাইসা আক্তার ও দুই বছর বয়সী ছেলে মো. নিরবকে গলা কেটে হত্যা করে তার দেবর নজরুল ইসলাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত না হওয়া, পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ, আর্থিক চাপ, মানসিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা এসব নৃশংসতার মূল কারণ। পাশাপাশি সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অবহেলা এবং সহিংসতার প্রতি অসহিষ্ণু মনোভাব এ ধরনের ঘটনার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। একইসঙ্গে মাদকাসক্তি, অনলাইন আসক্তি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও অনেক ক্ষেত্রে সহিংস আচরণকে উস্কে দিচ্ছে। তাদের অপরাধ সংঘটনের পর বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধে আগাম সামাজিক উদ্যোগ নেয়াও এখন সময়ের দাবি।

সমাজ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নেহাল করিম মানবজমিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় দেশে একের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আইনের শাসন নেই- মানুষ এখন বেপরোয়া। আইনের শাসন নিশ্চিত না হওয়ায় মানুষ আরও বেশি অপরাধ করছে। এ ছাড়া দেশের একটা বড় অংশ বেকার- তারা আয়ের উদ্দেশ্যে অনেক অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ এর কারণ।