রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে হামলার ঘটনায় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একপক্ষ বলছে, মাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা মাদক বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে হামলা ও সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। অন্যপক্ষ বলছে, ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ ছিল মূলত প্রভাব বিস্তারের কৌশল। মাজার ঘিরে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই হামলা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শগত আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যও এই হামলার অন্যতম কারণ।
স্থানীয়রা মনে করছেন, ঘটনাটি কেবল উগ্রবাদ, মাদক কিংবা অপরাধ সংশ্লিষ্ট নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে মাজার কমিটির নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, ধর্মীয় মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার। রয়েছে মাজারকেন্দ্রিক প্রভাব, অনুসারী নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক লেনদেন। এছাড়া এই মাজারের রয়েছে হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। সব কিছু মিলিয়েই শাহ আলীর মাজারে সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
আধ্যাত্মিকতা ও মাজার ব্যবসা
ইসলামের বাহ্যিক বিধিবিধান মানাকেই শরিয়ত বলা হয়ে থাকে। মাজারবিরোধীরা এই দিকটিকে গুরুত্ব দিলেও মাজারপন্থিদের বিশ্বাস, শরিয়ত পালনের মাধ্যমে সুফিরা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ অর্জন করেন। জিকির, ধ্যান ও আত্মসংযমের মাধ্যমে ভক্তরা আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় মাজার শুধু ধর্মীয় স্থান নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে। মাজার ঘিরে মসজিদ, মাদ্রাসা, বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে এবং মাজারপন্থি মানুষ, এমনকি ভিন্ন ধর্মের অনেকের কাছেও এগুলো সম্মানের স্থান।
তবে মাজারকে ঘিরে বিতর্কও দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের অভিযোগ, কোথাও কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, শিরকচর্চা ও অপরাধী চক্রের প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে সমর্থকরা এটিকে সুফি ঐতিহ্যের অংশ মনে করেন। এ মতভেদ কখনও সংঘাত ও সহিংসতারও কারণ হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মাজারের প্রভাব রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতাই তাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি শুরু করেন মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে। ফলে মাজার বিতর্ক আজ শুধু ধর্মীয় নয়; এটি সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিরও বিষয়।
মাজারকেন্দ্রিক অপরাধের অভিযোগ
ছোট-বড় মাজারগুলোতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। দান, মানত ও নগদ অর্থ লেনদেনের কারণে এসব স্থান দিন-রাত খোলা ও জনসমাগমপূর্ণ থাকে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি। যেখানে সুযোগ পেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী চক্র।
মাজারগুলোতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। ছবি: আবির আহম্মেদ সুপ্ত
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, কিছু মাজার এলাকায় মাদক গ্রহণ ও খুচরা মাদক বেচাকেনা এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। মানুষের ভিড়ে বহিরাগতদের শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় অভিযানের খবর পেলেই কারবারিরা দ্রুত সরে যেতে সক্ষম হয়। সামনে ভাসমান যুবক, কিশোর, ভিক্ষুক বা ছদ্মবেশী ব্যক্তিদের দেখা গেলেও নেপথ্যে থাকে বড় মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ।
সব মাজারে নয়, তবে কিছু এলাকায় সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্রের গোপন যোগাযোগের স্থান হিসেবেও মাজার ব্যবহার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব জায়গাকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, নতুন সদস্য সংগ্রহ, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ কিংবা চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এর পাশাপাশি তাবিজ-কবজ, অলৌকিক চিকিৎসা বা সমস্যা সমাধানের নামে প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। জনবহুল পরিবেশের সুযোগে ছিনতাই, পকেটমার, শিশু নিখোঁজ বা পাচারের ঝুঁকিও থেকে যায় বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করছেন।
হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণের লড়াই
শাহ আলী মাজারের জমিতে কাঁচামাল গুদাম ও দোকানসহ অনেক স্থাপনা রয়েছে। এসব পরিচালনা করার জন্য শতাধিক কর্মী নিয়োজিত আছেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর বা ৯৭ দশমিক ৪০ বিঘা। এর মধ্যে ৭৫ বিঘা মাজারের নামে ওয়াকফ করা সম্পত্তি। কিন্তু স্থানীয়দের মতে, মাত্র ৫ দশমিক ৭৬ একর জমি মাজারের দখলে রয়েছে।
মাজারের হাজার কোটি টাকার ওয়াকফ সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা কাঁচামালের আড়ত ও দোকান বরাদ্দেও রয়েছে অনিয়ম। এসব মার্কেটে চাঁদাবাজিও এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এর সবই হয়ে আসছে রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রচ্ছায়ায়। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির তদারকির হাতবদল হয়। শাহ আলী মাজার ও বিশাল সম্পত্তির দেখভালে জড়িতদের দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন।
শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারের আছে হাজার কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। ছবি: আবির আহম্মেদ সুপ্ত
শাহ আলীর মাজারকে কেন্দ্র করে অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের লড়াই চলে আসছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শাহ আলী মাজার মার্কেটের দোকান মালিকদের ভোগদখলে রয়েছে মাজারের ৭৫ বিঘা জমি। এই সম্পত্তির পুরোটাই ওয়াকফ সম্পত্তি। ২০২২ সালে এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিটও হয়েছিল।
‘তৌহিদী জনতা’ বিতর্ক
বিভিন্ন মহলের বিশিষ্টজনদের দাবি, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মাজারসহ ধর্মীয় স্থাপনায় হামলাকারীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে। হামলাগুলোকে ইমানি চেতনায় বিশ্বাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ হিসেবে উপস্থাপন করে প্রকৃত সংগঠক বা স্বার্থান্বেষী পক্ষ নিজেদের আড়ালে রাখার সুযোগ পাচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
সুন্নি মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব স উ ম আবদুস সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় কুমিল্লার লাকসামে প্রথম মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে। একটি সরকার পরিবর্তনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে মাজারে হামলার খবর সামনে আসে। তার প্রশ্ন, সরকার পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু এর পরপরই কেন ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা শুরু হবে?
তার মতে, ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং দীর্ঘদিন নীরব থাকা কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে নিজেদের আড়াল করছে। একটি সংগঠিত বা রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মাজারকেন্দ্রিক মাদক বা অপরাধের অভিযোগ প্রসঙ্গে স উ ম আবদুস সামাদ বলেন, ‘হামলাকারীরা অনেক ক্ষেত্রে ‘মাদকবিরোধী অভিযানকে’ যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। কিন্তু দেশে যখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে, তখন সাধারণ জনগণ কেন আইন হাতে তুলে নেবে?’ তার মতে, কোথাও অপরাধ থাকলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাই তদন্ত, গ্রেফতার ও বিচার করবে, সংগঠিত হামলা কোনোভাবেই স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় আচরণ হতে পারে না।
শাহ আলী মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর বা ৯৭ দশমিক ৪০ বিঘা। ছবি: আবির আহম্মেদ সুপ্ত
ইসলামিক বুদ্ধিজীবী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান শাহসুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদী মাজারে হামলার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ নয়।’ তার মতে, কোনও মাজারে শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে তা বন্ধে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়াই সঠিক পথ। অজুহাত তৈরি করে হামলা চালানো ইসলামের জন্য অশুভ ইঙ্গিত বহন করে।
মাজারকেন্দ্রিক অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোথাও কোথাও গাঁজা সেবন, মদের আড্ডা বা অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেলেও সেগুলো বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের। মাজারে শায়িত অলি-আউলিয়া। তাই একদিকে যেমন মাজারে হামলা বন্ধ করতে হবে, অন্যদিকে মাজার এলাকায় অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড রোধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার জামায়াতের
এদিকে হামলার পর এ ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শাহ আলী মাজারের ঘটনায় জামায়াতের কোনও সম্পৃক্ততা নেই এবং এ বিষয়ে দল আগেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। তার দাবি, অতীতের মতো এখনও একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আমরা চিনি না। জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অপ্রমাণিত ও ভিত্তিহীন।’
যদিও এই ‘অস্বীকার যথেষ্ট নয়’ নয় বলে মনে করছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জামায়াতসহ ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার উচিত। দেশের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।’
সরকারকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
পুলিশের তথ্য ও তদন্ত অগ্রগতি
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৬৮টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে ৭০ জনকে। একই সময়ে মাজারকেন্দ্রিক হুমকি সংক্রান্ত অভিযোগে বিভিন্ন থানায় ৪০টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ২৭টি মামলা হয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে তদন্ত শেষে ৯টিতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে ছয়টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে ১২টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) মাজারে হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে বলেও জানান শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে তাদের দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে হামলার কারণ ও সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।


