Image description

দেশে ইপিআই-এর মাধ্যমে ৯টি টিকার সাহায্যে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে সাতটি টিকা। এসব টিকা শিশুরা সময়মতো না পেলে রোগগুলোর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে। যেমনটা হয়েছে এবার হামের টিকার অভাবে। সঠিক সময়ে দেশে হামের টিকা না পাওয়ায় সাড়ে চার শতাধিক শিশু মারা গেছে ইতিমধ্যে। আক্রান্ত হয়েছে অর্ধলাখ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের নাজুক পরিস্থিতি আবারো সামনে এসেছে। দেশব্যাপী শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম এবং গণটিকা ক্যাম্প সঠিক সময় না হওয়ায় হামে এ পরিস্থিতি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়। করোনার প্রকোপের সময়ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মমন্বয়হীনতা ও ক্রয়-প্রক্রিয়ায় জটিলতায় টিকার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। যা থেকে আজকের পরিস্থিতি।

টিকা ঘাটতি প্রসঙ্গে দেশের জনস্বাস্থ্যবিদ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, হামের টিকার প্রথম লট এসেছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু দ্বিতীয় লটের টিকা দেরি করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আসে। এতে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়। সময়মতো ক্যাম্পেইন হয়নি। এই সময়ে নির্বাচন চলে আসায় সময়টা দীর্ঘ হয়ে যায়। আবার গত বছর স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্দোলন করায় টিকাদানের গ্যাপ তৈরি হতে থাকে। তবে রুটিন টিকা চলছিল। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। যে টিকা এসেছিল ওই টিকা দিয়েই এবছর ক্যাম্পেইন শুরু হয় বলে জানান তিনি। তারপর এবছর রাজস্বের অর্থছাড় করা টাকায় ক্রয় করা টিকা আসে দু’সপ্তাহ আগে।

তিনি আরও বলেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টেন্ডার নিয়ে টিকা ক্রয়ে অর্থছাড় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এদিকে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা নিয়ে দ্বন্দ্বে সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। তিনি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জরুরি এসব বিষয়ে আইনের আরও সহজকরণ করার পরামর্শ দেন। ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, করোনার সময় ২০২০-২১ সাল থেকে হামের টিকা দেয়ার গ্যাপ তৈরি হতে থাকে দেশে।

২ বা ৩ বছর পর ক্যাম্পেইন করে টিকা দেয়ার কথা থাকলেও তা সঠিকভাবে হয়নি। এই সময়ে পঞ্চম ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল। ক্যাম্পেইন সঠিক সময় না হওয়ায় হামের প্রকোপ বেড়ে দেশে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে এসে অস্বাভাবিক গ্যাপ তৈরি হয় হামের টিকায়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে টিকার ক্যাম্পেইন আরও পিছিয়ে যায়। আর এতে ২০২৬ সালে জানুয়ারি মাসে এসে বিস্ফোরণ তৈরি হয় হামে। বাড়তে থাকে শিশুমৃত্যু ও আক্রান্ত। তিনি বলেন, গণটিকা ক্যাম্পেইনে ৫ বছর পর্যন্ত শিশুকে টিকা দেয়া হয়। নিয়মিত টিকাদানে ৫ শতাংশ শিশু বাদ পড়লে সম্পূরক টিকাদান ক্যাম্পেইনে তা কাভার করা হয়।

দেশে সরকারিভাবে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত টিকা সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ‘সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ (ইপিআই)-এর কর্মকর্তারা। বর্তমানে দেশে ইপিআই-এর মাধ্যমে ৯টি টিকার সাহায্যে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি, পাঁচটি রোগ (ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা) রুখতে পেন্টা, নিউমোনিয়ার জন্য পিসিভি, পোলিও নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি এবং হাম ও রুবেলা সুরক্ষায় এমআর টিকা। এ ছাড়া কিশোরীদের জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া সুরক্ষায় টিডি টিকা দেয়া হয়।

কীভাবে টিকার ঘাটতি তৈরি হলো জানতে চাইলে ইপিআই-এর সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, এ বিষয়ে পলিসি মেকার লেভেলে বলবে। আমরা কর্মসূচি দেখি। আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিআই-এর এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম সর্বদা চলমান ছিল।

রুটিন টিকা কার্যক্রম আমাদের কখনোই বন্ধ হয়নি। হঠাৎ কেন টিকার ঘাটতি পড়লো এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, বিগত সময়ে টিকা ক্রয় করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি)-এর মাধ্যমে। কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওপি বন্ধ করে দেয়ায় টিকা ক্রয়ে বাধাগ্রস্ত হয় অর্থছাড়ের কারণে। মূলত ওপি বন্ধ হওয়ায় আরও কিছু কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে টিকার ঘাটতি পড়ে যায়।

এদিকে, রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক জনসচেতনতা সপ্তাহ উদ্বোধন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকার তীব্র ঘাটতি বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘২০২০ সালে ডিসেম্বরে সর্বশেষ হয়েছে, তারপরে ’২৬ সাল পর্যন্ত আমরা শুরু করার আগপর্যন্ত মিজেলসের কোনো টিকা দেয়া হয় নাই।

এমনকি মিজেলসের একটা টিকা আমাদের হাতে ছিল না। ইউনিসেফের সহযোগিতায় দেশের আক্রান্ত জেলা, উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনগুলোয় ব্যাপকভাবে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর পর হামের প্রকোপ কিছুটা কমেছে বলে জানান মন্ত্রী। চলতি মৌসুমে হামের প্রাদুর্ভাব অতিমাত্রায় বাড়ার কারণ হিসেবে মন্ত্রী মায়েদের পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করেন। মন্ত্রী জানান, তিনি বেশ কিছু হাসপাতালে পরিদর্শন করে জেনেছেন, অনেক মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর পর্যায়ে নেই। তিনি মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিতে জোর দেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মায়েদের পুষ্টি ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করতে পারলে অনেক ব্যাধি থেকেই মুক্ত থাকা সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারের দ্রুত হামের টিকাদান কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় হাম সংক্রমণ ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত ৫ই এপ্রিল শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেয়ার পর সংক্রমণপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. চিরঞ্জিত দাস বলেন, ভ্যাকসিন কার্যকারিতা দেখাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ৩০ উপজেলায় ৫ই এপ্রিল থেকে টিকাদান কার্যক্রম চালুর পর বর্তমানে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে, ১৭ই এপ্রিলের পর থেকে ওইসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা দৃশ্যমানভাবে কমতে শুরু করেছে। এই ফলাফল টিকাদানের কার্যকারিতার স্পষ্ট প্রমাণ। একই প্রবণতা ৫টি সিটি করপোরেশন এলাকায়ও দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দেশে বর্তমানে হামে শিশু মৃত্যুর হার সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে টিকাদান কর্মসূচির পূর্ণ সুফল পেতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। কারণ, ভ্যাকসিন নেয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে।