Image description

একটা সময় ছিল, যখন ঢাকার কমলাপুরে ট্রেনের টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ত। পরের দিনের টিকিটের আশায় আগের দিন সন্ধ্যায় বিছানা পেতে শুরু হতো অপেক্ষা। সেই ছবি এখন আর নেই। নেই কমলাপুরের কোলাহল। সব টিকিট চলে গেছে অন্তর্জালে। এতে কমলাপুর ফাঁকা হলেও অন্তরের জ্বালা কমেনি একটুও। টিকিটের পেছনে ছোটার লোক তো কমেনি, বরং বেড়েছে হয়তো। আগামীর সময়-এর কষা অঙ্ক বলছে, ট্রেনের এক টিকিটের জন্য যুদ্ধ করেছেন অন্তত ৩৯ জন।

গত পঁাচ দিন ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি করেছে রেলওয়ে। গত বুধবার শুরু হওয়া অগ্রিম টিকিটের বিক্রির যাত্রা শেষ হয়েছে গত রবিবার। গতকাল সোমবার হয়নি টিকিট বিক্রি। ঈদের দিন টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকবে, তাই আগাম টিকিট বিক্রিও বন্ধ। এই পাঁচ দিনে রেলের টিকিট পেতে অ্যাপ ও ওয়েবসাইট মিলিয়ে মোট হিট (যতবার চেষ্টা করা হয়েছে) পড়েছে ২২ কোটি ১৫ লাখ। অথচ সব ধরনের আসন মিলিয়ে টিকিট রয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৭টি। পার্থক্যের ব্যবধানেই স্পষ্ট হচ্ছে টিকিটের লড়াইটা।

এখানে ২২ কোটি ১৫ লাখ হিট মানেই পুরোটা চাহিদা নয়। কেন না, একজন কতবার হিট করেছেন, তা সুনির্দিষ্ট জানার সুযোগ নেই। তবে অনুমান করার সুযোগ আছে। রেলওয়ের টিকিট বিক্রি ও প্রস্তুতের দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সহজ’। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে একটি নীতিমালা প্রকাশিত রয়েছে। তাতে লেখা, কোনো ব্যবহারকারী একই ইউআরএল (ইন্টারনেটের ঠিকানা) দিয়ে ১ মিনিটে ১০ বারের বেশি টিকিটের জন্য অনুরোধ করলে তাকে সাময়িকভাবে পাঁচ মিনিটের জন্য ব্লক করা হবে। আবার কোনো ব্যবহারকারী ১৫ মিনিটের মধ্যে ১২ বার বা তার বেশি সিট সিলেকশন (আসন বাছাই) করলে, তার সিট সিলেকশন সুবিধা এক ঘণ্টার জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

এই নিয়মের বেড়াজাল থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে একজন ১২ বারের বেশি চেষ্টা করছেন না। আবার ১৫ মিনিট পর টিকিট পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। কতটা কঠিন হয়, সেটি এক হিসাবেই পরিষ্কার হবে। ১৩ মে ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়। যারা ২৩ মে ঢাকা ছাড়বেন, শুধু তারাই টিকিট সংগ্রহ করেছেন। ঢাকা থেকে মোট টিকিট বরাদ্দ ছিল ৩১ হাজার ২৪০টি। সকাল ৮টায় পশ্চিমাঞ্চলের টিকিট বিক্রি শুরু হয়। পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ছিল ১৫ হাজার ২৬৬ টিকিট। বিক্রি শুরু হওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে ১২ হাজার ৫২৭ টিকিট শেষ। অর্থাৎ প্রথম ১৫ মিনিটেই ৮২ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়েছে। বাকি সময়ের জন্য অবশিষ্ট ছিল ২ হাজার ৭৩৯ টিকিট। ফলে ধরে নেওয়া যায়, ১২ বারে কেউ টিকিট না পেলে ১৫ মিনিট বিরতির পর চেষ্টা করে টিকিট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

তাহলে অঙ্কটা যদি এমন হয়, একজন সর্বোচ্চ ১২ বার চেষ্টা করেছেন এবং টিকিট না পেয়ে সর্বোচ্চ তিন দিন চেষ্টা করেছেন, সেক্ষেত্রেও একজন সর্বোচ্চ ৩৬ বার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, ৬১ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৮ জন মিলে ২২ কোটি ১৫ লাখ বার চেষ্টা করেছেন। এই পাঁচ দিনের জন্য যেহেতু ট্রেনের আসন ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৭টি। তাই ধরে নেওয়া যায়, একটি টিকিটের জন্য অন্তত ৩৯ জনের চাহিদা রয়েছে।

চাহিদার তুলনায় জোগানের স্বল্পতা নিয়ে আগামীর সময়-এর সঙ্গে কথা বলেছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। তার মতে, এই ব্যবধান কমানো কঠিন, ঈদের পুরো চাহিদাও মেটানো কঠিন। দীর্ঘ পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে ট্রেনে হয়তো যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো যাবে। তবে এই ব্যাপক চাহিদা মেটানো যাবে না। তাই সবাই টিকিট পাবেন না— এটাই স্বাভাবিক।

রেলওয়ের তথ্য বলছে, ঈদের আগের পঁাচ দিন— অর্থাৎ ২৩ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২১৮ ট্রেন ছেড়ে যাবে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের পথে যাবে ১১৮টি। পশ্চিমাঞ্চলে যাবে ১০০টি। পূর্বাঞ্চলের ট্রেনে ঢাকা থেকে বরাদ্দ থাকছে ৮১ হাজার ৩৭০ আসন। আর পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেনে থাকবে ৭৭ হাজার ৮১৭ আসন। সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল ২৫ মের টিকিটের। ওইদিন ঈদের আগের শেষ কর্মদিবস। তাই টিকিট পেতে হিট পড়েছে ৫ কোটি ৫৫ লাখ। এরপরই ২৬ মের চাহিদা বেশি ছিল। এদিনের টিকিট পেতে ৫ কোটি ১৩ লাখ বার হিট হয়েছে।