Image description

ফেরাউন ছিল মিসরের বাদশাহদের উপাধি। হজরত ইসার (আ.) জন্মের তিন হাজার বছর আগ থেকে বাদশাহ সিকান্দারের যুগ পর্যন্ত ফেরাউনের একত্রিশতম বংশ মিসরের ওপর রাজত্ব করে আসছে। মুসার (আ.) জন্মের সময় মিসরের বাদশাহ ছিল দ্বিতীয় রিমসিস বা রামেসিস। সে মিসরের শাসকদের উনবিংশ বংশধর। তারই কাছে মুসা (আ.) বেড়ে উঠেন। (কাসাসুল কোরআন, মূল: মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, মাকতাবাতুল ইসলাম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১২-১৫)

 

আসিয়া বিনতে মুজাহিম মিসরের ফেরাউন দ্বিতীয় রিমসিসের স্ত্রী। আসিয়া ধনী পরিবারের ভদ্র, শালীন ও জ্ঞানী মেয়ে। তিনি এক আল্লাহ বিশ্বাস করতেন। মানুষ ভালোবাসতেন, মানুষের প্রতি দয়া করতেন। অসহায়ের পাশে দাঁড়াতেন। স্বামী ফেরাউন নিজেকে স্রষ্টা দাবি করত। সে ছিল অত্যাচারী ও বদমেজাজি বাদশাহ। অহংকার, দম্ভ ও অহমিকায় পরিপূর্ণ ছিল তার মসনদ।

 

ফেরাউন বনি ইসরায়েলিদের পছন্দ করত না। অত্যাচার করত। ফেরাউন স্বপ্নের ব্যাখ্যায় জানতে পেরেছিল, বনি ইসরায়েলের এক ছেলেসন্তান তার মসনদ ধ্বংস করে দেবে। সে বনি ইসরায়েলে জন্ম নেওয়া পুত্রসন্তানদের হত্যার আদেশ জারি করেছিল। এ সময় মুসার (আ.) জন্ম হয়। আল্লাহ মুসাকে (আ.) ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন।

 

আল্লাহর আদেশে শিশু মুসার মা তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কাঠের সিন্দুকে ভরে নীল নদে ভাসিয়ে দেন। এই সিন্দুক ফেরাউনের স্ত্রী আল্লাহবিশ্বাসী আসিয়ার হাতে পড়ে। শিশু মুসার অপূর্ব সুন্দর চেহারা আসিয়ার মনে দাগ কাটে। তাঁর প্রতি মায়া জন্মায়। মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে জেগে ওঠে আসিয়ার মনে। তিনি তাকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।

 

ছেলেসন্তান দেখে ফেরাউন চটে যায়। কিন্তু স্ত্রীর ব্যক্তিত্বের কাছে হেরে যায় সে। আসিয়ার কাছে রাজকীয় সুখানন্দে মুসা লালিত-পালিত হতে থাকেন, বড় হতে থাকেন। আসিয়া লাভ করেন মুসার (আ.) পালকমাতা হওয়ার গৌরব। পবত্রি কোরআনে এরশাদ এসেছে, ‘ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার চোখ শীতলকারী। তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। অথচ তারা উপলব্ধি করতে পারেনি।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৯)

 

আসিয়া ফেরাউনের স্ত্রী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ফেরাউনের দুশ্চরিত্রের কোনো স্বভাব তাকে গ্রাস করতে পারেনি। অত্যাচারীর ঘরে থেকেও তিনি ছিলেন মানবতাবাদী ও মানুষের হিতৈষী।

 

আসিয়া তখন অবিশ্বাসী। তার স্বামী ফেরাউনই খোদা। একদিন নারীদের অন্দরমহলে বসে আছেন আসিয়া। ফেরাউনের অন্য স্ত্রী, মেয়ে ও দাসীরাও আছেন সেখানে। প্রাসাদের কোষাধ্যক্ষের স্ত্রী ফেরাউনের এক মেয়ের চুল বিনুনি করছিল। হঠাৎ তার হাত থেকে চিরুনি পড়ে গেল। সে বলল, ‘আল্লাহ অবিশ্বাসীরা ধ্বংস হোক’। ফেরাউনের মেয়ে এ কথা শুনে চমকে গেল। বলল, ‘আমার বাবা ছাড়াও কি কোনো রব আছে।’ তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি আমার রব, আপনার আব্বারও রব, দুনিয়ার সবকিছুর পালনকর্তা।’ ফেরাউনের মেয়ে তার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। বিষয়টি জানাল বাবাকে।

 

ফেরাউন তাকে ডেকে পাঠাল। তার রব এবং ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। সে বলল, ‘আমি আমার রব, আপনার রব এবং প্রত্যেক বস্তুর রবের ইবাদত করি। শুধু তাঁরই ইবাদত করব।’ ফেরাউন জ্বলে উঠল। তাকে নানাবিধ শাস্তি দিল। তাঁর হাত-পায়ে পেরেক মেরে দিল। সাপ ছেড়ে দিল তাঁর ওপর। তবুও সে ঈমানে অবিচল রইল। আল্লাহপ্রেমে ডুবে রইল।

 

ফেরাউন বলল, ‘তুমি নিবৃত্ত না হলে তোমার ছেলেকে জবাই করব।’

 

সে বলল, ‘তোমার যা ইচ্ছা করো, আমার রব শুধু তিনিই।’

 

ফেরাউন তার চোখের সামনে এক ছেলেকে জবাই করে ফেলল। ছেলের আত্মা তাকে সুসংবাদ দিল। আল্লাহর প্রতিদানের কথা বলল। বিশ্বাসী নারী ধৈর্য ধরল। ঈমানের ওপর অবিচল রইল। ফেরাউন আরেকদিন এসে তাকে আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রস্তাব করল। বিশ্বাসী নারী আল্লাহপ্রেমে মজে রইল। ফেরাউন তার আরেক ছেলেকে চোখের সামনে জবাই করে দিল। এই ছেলের আত্মা আগের ছেলের মতো সুসংবাদ দিল। আল্লাহর প্রতিদানের কথা স্মরণ করাল।

 

একদিন বিশ্বাসী নারীকেও জবাই করল ফেরাউন। তার আত্মাও জান্নাতের নেয়ামত ও আল্লাহর প্রতিদানের কথা সগৌরবে বলল। বিশ্বাসী নারী এবং তার দুই সন্তানের আত্মার কথা শুনে ঈমান আনেন ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১১৪)

 

নিজের স্ত্রী অন্যের উপাসনা করে—এমন খবর জানতে পেরে ফেরাউন স্ত্রীকে বোঝাতে থাকে। নিজের বিশাল সাম্রাজ্য ও প্রজাদের কথা বলে। কিন্তু আসিয়া সত্য ধর্মের ওপর পাহাড়ের মতো অবিচল, অটল থাকে। ফেরাউন দেখল, কাজ হয় না। স্ত্রী ফিরে আসছে না তার দলে। সে বিশেষ লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে আসিয়াকে হত্যার আদেশ দেয়।

 

একদিন ফেরাউনের সৈন্য-সামন্তরা আসিয়ার চার হাত-পায়ে পেরেক মেরে বুকের ওপর ভারী পাথর রেখে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে ফেলে দেয়। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, ফেরাউন একটি ভারী পাথর তাঁর মাথার ওপর ফেলে দেয়। (তাফসিরে মাজহারির সূত্রে তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মূল: মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ১৩৮৯)

 

আসিয়ার দেহ রক্তাক্ত হয়। শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। তবু তিনি মুখে জারি রাখেন আল্লাহর নাম। অন্তরে জাগিয়ে রাখেন প্রভুপ্রেমের স্বাদ। জীবনের বিনিময়ে ঈমানকে রক্ষা করেন। দুনিয়ার রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন জান্নাতে আল্লাহর পাশে একটি ঘর।

 

তাঁর প্রার্থনার কথা কোরআনে এসেছে এভাবে—‘হে আমার প্রতিপালক, আমার জন্য আপনার কাছে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন। আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন। আমাকে মুক্তি দিন অত্যাচারী সম্প্রদায় থেকে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১১)