Image description

চলতি বছরের শেষ দিকে দেশজুড়ে বাজবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দামামা। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণার পরই গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। ব্যানার, পোস্টার আর আগাম গণসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে পাড়া-মহল্লা ও চায়ের আড্ডা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের এই নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচারণা। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এই দৌড়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এনসিপি এরই মধ্যে ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় নিজেদের চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াতেরও প্রার্থী তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও, দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বসে নেই; তারা পুরোদমে নিজেদের মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এবার জমজমাট ভোটের লড়াইয়ের অপেক্ষায় সাধারণ মানুষ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য যুগান্তরকে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে দল প্রার্থী চূড়ান্ত করবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, প্রার্থী বাছাই অনেকটাই সম্পন্ন। যে কোনো সময় চূড়ান্ত তালিকা আসবে।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, রোববার প্রথম ধাপে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পরে বাকি প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ডিসেম্বরেই এ নির্বাচন শুরু হতে পারে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ২০ এপ্রিল নগর জামায়াতের রুকন সম্মেলন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসাবে অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালীর নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। এদিকে চসিক নির্বাচন যখনই হোক, বিএনপি থেকে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন পুনরায় নির্বাচন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। চসিকে বিএনপি মনোনীত সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তাকে এনসিপি দলে ভিড়িয়ে মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি বিএনপি থেকে পুনরায় মেয়র পদে মনোনয়ন চাইতে পারেন। এছাড়াও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য শামসুল আলম, নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে।

এদিকে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে চসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপি নেতাদের অনেকে পোস্টার সাঁটিয়েছেন। আলকরণ ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী মিন্টু, জামালখান ওয়ার্ডে সাহেদ বক্স, দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডে আবদুল মান্নান, হেলাল চৌধুরী, ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে ইসমাঈল বালিসহ অনেকের পোস্টার দেখা গেছে।

জামালপুর : জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট ও দোয়া চাইছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেউ গণসংযোগ, কেউ উঠান বৈঠক আবার কেউ লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি সমর্থিত নেতাকর্মীরাই সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রচার শুরু করেছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ভোটারদের মন জোগাতে এলাকার উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক ও সন্ত্রাস দমনসহ নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

পাবনা : বিএনপি ও জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেছেন। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত এ দুটি দলের নেতাদের ছবি সংবলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে। কেউ কেউ বড় বড় বিলবোর্ডও লাগিয়েছেন। জামায়াত ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভায় তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন-পাবনা পৌরসভায় মেয়র পদে মাওলানা আব্দুল গাফ্ফার খান, ঈশ্বরদী পৌরসভায় গোলাম আজম, সাঁথিয়ায় মোস্তফা কামাল মানিক, বেড়ায় মাওলানা আবু দাউদ, আটঘরিয়ায় মাওলানা সাইদুল ইসলাম মোল্লা, ফরিদপুর পৌরসভায় মো. মজিবুর রহমান ও সুজানগর পৌরসভায় ফারুক ই আজম।

চাঁদপুর ও হাজীগঞ্জ : হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচারণায় ব্যস্ত। তারা ব্যানার-পোস্টার ও গণসংযোগে সরগরম করে রেখেছেন মাঠ। একই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মোজাম্মেল হোসেন মজুমদার পরান, ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএম কলিম উল্যাহ ও পৌর মেয়র পদে জাকির মজুমদারের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াত। তবে হাইমচর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম শফিক জানান, এ উপজেলায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা তেমন একটা নেই।

মাগুরা : বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রঙিন ব্যানার ও পোস্টার টানিয়েছেন। পাশাপাশি দলীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সমর্থন আদায়ে দৌড়ঝাঁপ ও লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। মেয়র পদে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসান ইমাম সুজা, আলমগীর হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুদ হাসান খান কিজিল, বিএনপি নেতা মুন্সী মঞ্জুরুল হাসান পিংকু এবং জেলা যুবদল সভাপতি অ্যাডভোকেট ওয়াসিকুর রহমান কল্লোল প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পেতে বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ, পাড়া-মহল্লায় মতবিনিময় সভা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে মেয়র পদে মাসুদুল আলমকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মাগুরা সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশী হিসাবে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। জামায়াতের প্রার্থী হিসাবে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আজমত হোসেনকে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা : বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দল এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেয়নি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেলেই সাংগঠনিকভাবে মাঠে নামবেন তারা।

জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, অভিজ্ঞ ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করছেন।

লামা (বান্দরবান) : মেয়র পদে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র আমির হোসেন (আমু)। এছাড়া জামায়াত নেতা অধ্যাপক মো. ফারুক আহমদও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে আলোচনায় রয়েছেন।

ফেনী : উপজেলা, পৌরসভাসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াত। তবে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, প্রার্থী ঘোষণা হয় কেন্দ্র থেকে। গতকাল প্রার্থিতা নির্ধারণের বিষয়ে কিছু কথাবার্তা হয়েছে। শিগগিরই আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত হবে। এনসিপির জেলা কমিটির দপ্তর সম্পাদক ওমর ফারুক জানান, তাদের শুধু সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল পৌরসভায় জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুল হক সানু, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক খন্দকার আহমেদুল হক সাতিল, শহর বিএনপির বহিষ্কৃত সভাপতি মেহেদী হাসান আলীম, শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এজাজুল হক সবুজ নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। এছাড়াও জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের নেতা বিভিন্ন পদের প্রার্থী হিসাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

গাইবান্ধা : জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুন্নবী টিটুল বলেন, দলীয়ভাবে এখনো পৌর মেয়র পদে নাম ঘোষণা করা হয়নি। তবে শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ, বিএনপি নেতা শহীদুজ্জামান শহীদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবু বক্কর সিদ্দিক স্বপনসহ অন্তত ৫ নেতা ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি রোকনুজ্জামান রোকন জানান, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ফয়সাল কবির রানাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার পক্ষে ইতোমধ্যে শহরে দোয়া কামনা করে পোস্টার ও ফেস্টুন লাগানো হয়েছে। এছাড়া খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিশ একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে।

খুলনা : জেলার ৯টি উপজেলায় বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে তৎপরতা দেখা গেছে। ডুমুরিয়ায় অ্যাডভোকেট মুনিমুর রহমান নয়ন, পাইকগাছায় এসএম এনামুল হক, দাকোপে মোজাফফার হোসেন, কয়রায় অ্যাডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম ও নুরুল আমিন বাবুল, ফুলতলায় সাব্বির হোসেন রানা এবং বটিয়াঘাটায় এজাজুর রহমান শামীম ও খাইরুল ইসলাম জনির নাম আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে। কয়রা সদর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মিজানুর রহমানের নামও শোনা যাচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা : বিএনপির বহু নেতা প্রার্থী হিসাবে রীতিমতো লিফলেট, বিলবোর্ড ও ব্যানার বানিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সরব প্রচার চালাচ্ছেন। জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটু যুগান্তরকে বলেন, আমরা মাঠে একক প্রার্থী চাই। এজন্য আমরা স্থানীয়ভাবে বসে নেতাকর্মীদের সমন্বয় করতে বলেছি। চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। ১৫ মের মধ্যে আমরা দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করব।

পিরোজপুর : পিরোজপুর সদরে বিএনপির প্রায় এক ডজন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এরা হলেন-জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাইদুল ইসলাম কিসমত, কেন্দ্রীয় নেত্রী এলিজা জামান, সাবেক সদস্য সচিব ওয়াহিদুজ্জামান লাভলু গাজী ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন মল্লিক নাসির। এখানে জামায়াতের একক প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ জহিরুল হক। এছাড়া এনসিপির জেলা কমিটির আহ্বায়ক হুমায়ুন কবীর ও সদস্য সচিব আল আমীন খানের নাম শোনা যাচ্ছে।