Image description

নির্দোষ হয়েও জীবনের ২০টি বছর ছিলেন অন্ধাকার কনডেম সেলে। পরপর দুই আদালতে ফাঁসির রায় হওয়ার পর জেল থেকে জীবিত ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর জন্যই ছিল তার অপেক্ষা। কয়েক বছর আগে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে নির্দোষ প্রমাণিত হন খুলনার জাহিদ শেখ (৫৫)। স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার অভিযোগে শ্বশুরের করা মামলায় ২০ বছর সাজা কেটে কারাগার থেকে অবশেষে মুক্ত হন তিনি। কিন্তু কে হত্যা করল তার প্রিয়জনদের জানতে চান সেই রহস্য। পরিবার, পরিজন, সহায়-সম্বল সব হারিয়ে নিঃস্ব জাহিদ শেখ এখন খুলনা শহরের ভাঙারির দোকানে পেটে-ভাতে কাজ করছেন। জীবনের হারিয়ে যাওয়া ২০টি বছরের ক্ষতিপূরণ চাইছেন সরকারের কাছে। সম্প্রতি কথা হয় জাহিদ শেখের সঙ্গে। যুগান্তরের কাছে খুলে বলেন নিজের অসহায়ত্বের কথা।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জাহিদ বলেন, ১৯৯৪ সালে বিয়ে করে বাগেরহাটের ফকিরহাটে শ্বশুরবাড়ির পাশেই ভাড়া বাড়িতে থাকতে শুরু করেন তিনি। তার একটি মেয়েও হয়। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি যশোরে গিয়ে রাতে আর ফিরতে পারেননি। ওই রাতেই তার স্ত্রী ও মেয়ে খুন হয়। পরদিন তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন শ্বশুর। ২০০০ সালের শুরুর দিকে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন জাহিদ। ওই বছরই বাগেরহাটের আদালত তার ফাঁসির আদেশ দেন। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হলে ২০০৪ সালে সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। কারাগার থেকেই ২০০৪ সালে আপিল বিভাগে জেল পিটিশন করেন জাহিদ, যা ২০০৭ সালে জেল আপিল হিসাবে গণ্য হয়। ২০২০ সালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগে ওই জেল আপিলের শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত মামলায় নানা অসংগতি পান। শুনানি শেষে ওই বছরের ২৫ আগস্ট আপিল বিভাগ জাহিদকে খালাস দেন।

কনডেম সেলে কাটানো ২০টি বছরের দুর্বিষহ জীবনের কথা ভুলতে পারছেন না জাহিদ। নির্দোষ হয়েও জীবদ্দশাতেই পেয়েছেন যেন নরকের স্বাদ। সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করে জাহিদ বলেন, আমার সামনে থেকে এক আসামিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে জম টুপি পরিয়ে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। কলেমা পড়তে পড়তে যান সেই আসামি। এরপরই তাকে ঝুলিয়ে দেয় ফাঁসিতে। সেই সময় আমিও ভাবতাম, আমাকেও হয়তো এভাবেই ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। মনে মনে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

জাহিদ বলেন, খুলনার কারাগারে থাকার পরও কেউ খোঁজই নেয়নি তার। এমন পরিস্থিতিতে বাইরের জগতের আলো দেখার আশাও বাদ দিয়েছিলাম। জেলে থাকা অবস্থায় মা-বাবাকে হারিয়েছি। নিজের বাড়ির সম্পত্তি বলতে যা ছিল, প্রথমদিকে তা মামলার খরচ চালাতেই চলে গেছে। ২০২০ সালে সেপ্টেম্বরে ছাড়া পাওয়ার পর উঠি খুলনা নগরের বাগমারা এলাকায় বড় ভাইয়ের বাড়িতে। তারও আর্থিক অবস্থা নাজুক। তিনি বলেন, ‘নিজের বলতে এখন আর কিছুই নেই। ভাইবোনদের আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ। বাধ্য হয়ে খুলনা শহরের এক ভাঙারির দোকানে পেটে-ভাতে কাজ করছি। জীবনের হারিয়ে যাওয়া ২০টি বছরের ক্ষতিপূরণ চাই সরকারের কাছে। এজন্য জাহিদ শেখ আইনজীবীদের শরণাপন্ন হয়েছেন, কিন্তু কেউ তার পক্ষে আদালতে দাঁড়াতে চাননি।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. সারওয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ফৌজদারি মামলায় কোনো আসামি খালাস পেলে, ক্ষতিপূরণ মামলা দায়েরের কোনো সুযোগ নেই। এ রকম সুযোগ থাকলে অনেকেই মামলা করতেন। এ বিষয়ে কোনো আইন নেই।