Image description
পিডির বাসায় আসবাবপত্র কিনে দেন ঠিকাদার

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি একাডেমিক ও একটি প্রশাসনিক ভবন এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য তিন তলাবিশিষ্ট। পৃথক দুটি হল নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজের শুরু থেকে কয়েকগুণ বেশি দামে ফার্নিচার ক্রয়, ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে টিএ/ডিএ উত্তোলন, ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশনের নামে অন্তত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুর। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে রাবিপ্রবি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের পিডি ছিলেন। নানা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ নানা অভিযোগে এ কর্মকর্তাকে বহিষ্কারের পর অশান্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কৃত কর্মকর্তা আবদুল গফুর নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা হিসাবে দাবি করছেন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বর্তমানে চাকরিতে পুনর্বহালের অপচেষ্টা করছেন তিনি। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগে রাবিপ্রবি ভিসি ড. আতিয়ার রহমানের কার্যালয়ে মঙ্গলবার তালা ঝুলিয়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তারা ভিসির অপসারণও দাবি করে।

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের (সরকারি ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সংস্থা) দশম জরুরি সভায় সদস্যদের সম্মতিক্রমে আবদুল গফুরকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে বলা হয়, আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। পরদিন ৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগে দলীয় প্রভাব, অনিয়মসহ নানা অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে চিঠি দেন আবদুল গফুর। চিঠিতে তিনি নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়েছেন। তিনি খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও মহালছড়ি উপজেলার বিএনপি সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। বরখাস্ত আদেশ স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন উচ্চ আদালত।

রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পান আবদুল গফুর। দায়িত্ব নেওয়ার পর ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ আত্মসাতে জড়ান তিনি। ৮০ হাজার টাকার টেবিল ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানোসহ ফার্নিচার খাতেই ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আবদুল গফুর। এছাড়া টিএ/ডিএ বিল নেওয়ার পরও বিভিন্ন যাতায়াত ও প্রশিক্ষণের জন্য দ্বিতীয়বার টাকা উত্তোলন করেন তিনি। এভাবে ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা নেন। ৪টি ভবনের টেন্ডার দিতে ১ শতাংশ হারে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা কমিশন নেন। এ নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার দুদকের কাছে অভিযোগ করেছেন। একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট তৈরি বাবদ নিয়েছেন ৩৭ লাখ টাকা। পরিকল্পিত বনায়নের নামে ছবি প্রদর্শন করে তুলে নেন ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা। তাই নয়, সরকারি টাকায় নিজের বাসার আসবাবপত্রও ক্রয় করেছেন আবদুল গফুর। বাসায় ব্যবহার করার জন্য আলমিরা, ফাইল কেবিনেট, চেয়ার-টেবিল, খাটসহ সবই ক্রয় করেছেন প্রকল্পের টাকায়। জয়নাল নামে একজন ঠিকাদার এসব আসবাবপত্র কিনে দেন বলে জানা গেছে।

প্রকল্পের কর্মচারীদের নামে অগ্রিম টাকা নেওয়ার বিধান না থাকলেও রাবিপ্রবি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে এমন অনিয়মও হয়েছে।

জানা গেছে, মার্শাল চাকমা নামে একজন কর্মচারীর নামে ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩২৮ টাকা, নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেকশন অফিসার আবদুল হকের নামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা ও মঞ্জুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৮ টাকা অগ্রিম নিয়ে খরচ করেছেন আবদুল গফুর। এছাড়া নিজের নামেও নিয়েছেন ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা। এর মধ্যে বেশকিছু ফাইলে অগ্রিম নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বাক্ষর নেই। বিভিন্ন ব্যয় দেখিয়ে এসব টাকা সমন্বয় করেছেন তিনি।

২০১৭ সালে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসাবে চাকরিতে যোগদান করেন আবদুল গফুর। ৩৫ বছরের বেশি বয়স এবং নন-টেকনিক্যাল ব্যক্তির এমন পদে যোগদান করা অসম্ভব হলেও আওয়ামী লীগের আমলে তা সম্ভব করেন তিনি। এছাড়া শিক্ষা জীবনে ২টি তৃতীয় বিভাগ, পূর্বে সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকা, নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু দুজনের অংশগ্রহণসহ নানা অসঙ্গতি ছিল সেই নিয়োগে।

তবে তৎকালীন রেজিস্ট্রার অঞ্জন কুমার চাকমার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সব বাধা পার হয়ে যান। প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা এক যুগ্ম সচিবকে নগদ অর্থ, লেকের মাছ ও ফল উপহার দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক হন তিনি।

পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পাহাড় কাটার অনুমোদন না নিয়ে ভবন তৈরির কাজ শুরু করেন সাবেক এই পিডি। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার আসামিও হন।

রাবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘রাবিপ্রবি স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন সতর্ক হবেন। কিন্তু না হয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে শুরু করেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে তাকে বহিষ্কার করেছে রিজেন্ট বোর্ড। বহিষ্কার হওয়ার পরও আবদুল গফুর ব্যাংক থেকে প্রকল্পের টাকা তুলতে চেয়েছিলেন। এ কারণে পরবর্তী পিডি নিয়োগ হওয়ার আগ পর্যন্ত রেজুলেশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করে তুলেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক পিডি আবদুল গফুরের মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে এবং একাধিকবার কল করলেও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।