Image description

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) জরুরি বিভাগে কাতরাচ্ছেন তানজিদুল ইসলাম রাহিম। তিনি ফেনী সদর থেকে এসেছেন। রোববার রাত সাড়ে ১২টায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যখম হয়েছে। বাম পায়ের হাড় ভাঙাসহ মাংস উঠে গর্ত হয়ে গেছে। জরুরি বিভাগের স্ট্রেচারে রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে।

রাহিমের মতো ঈদের ছুটিতে বেড়েছে দুর্ঘটনা, যাদের বেশিরভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। রাজধানীর নিটোরে ঈদের ছুটির কয়েক দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৭৭ জন রোগী।

সোমবার (২৩ মার্চ) নিটোর তথা পঙ্গু হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। হাসপাতালে হু হু করে বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা। ফলে স্বল্প জনবল দিয়ে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু তরুণ নয়, মোটরসাইকেলযাত্রী হিসেবে থাকা অনেক তরুণীও আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মূলত ঈদ উপলক্ষে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর কারণেই দুর্ঘটনা বেড়েছে বলে নিটোর সূত্রে জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বিজয় ইসলাম (২১)। তিনি নিটোরের ২১ নম্বর বেডে কাতরাচ্ছেন। ডান পায়ের হাড় ভেঙে কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়েছে। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই স্থানে রড লাগানো হয়েছে। ঈদের দিন পা ভাঙার পর অস্ত্রোপচারের পর যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি। শুধু বিজয় ইসলাম নন, তার মতো ১৭৭ জন তরুণ-তরুণী হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন।

 

jagonews24

রূপগঞ্জের এই তরুণ ঈদের দিন মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলাচল করছিলেন। ফাঁকা সড়কে মোটরসাইকেলের গতি ছিল অনেক বেশি। এমন সময় হঠাৎ করেই একটি অটোরিকশা ইউটার্ন নিতে যায়। কিন্তু গতির কারণে বাইক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি তিনি।

বিজয় ইসলাম বলেন, ‘অটোরিকশা কোনো কারণ ছাড়াই ডানে মোড় নিয়েছে। আমার বাইকের গতি অনেক বেশি ছিল, তাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। পরে সড়কের আইল্যান্ডে বাইক ধাক্কা লাগে।’

 

বিজয়ের ঠিক কয়েক বেড দূরে ডান পা ভেঙে কাতরাচ্ছেন এক যুবক। তিনি লক্ষ্মীপুর থেকে এসেছেন। বয়স সর্বোচ্চ ২১ বছর হবে। নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। মোটরসাইকেলের গতি অনেক বেশি ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সামনে পড়ে অটোরিকশা। দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পেছনে থাকা তরুণী সড়কে ছিটকে পড়ে। পাশাপাশি অটোরিকশায় আছড়ে পড়েন তরুণ। তরুণ নিটোরে ভর্তি হয়েছেন। হাত-পা ভাঙার পাশাপাশি ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে সড়কে পড়ে গেছে। অন্যদিকে তরুণীর ডান পায়ের হাড় ভেঙে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

অন্যদিকে নিটোরের ৪৮ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন মোহন আলম (২৫)। তিনি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে এসেছেন। তার ডান হাতের কনুইয়ের হাড় পৃথক হয়ে গেছে।

২৬ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন শিকদার ইউসুফ (২০)। তিনি ভালুকা, ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তার বুড়ো আঙুল পুরো কেটে পড়ে গেছে।

ইউসুফ বলেন, ‘ঈদের দিন অটোরিকশা ধাক্কা দিয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ সামনে এসে পড়ে। অটোরিকশার কারণেই আমার এ অবস্থা।’

মেহেরপুরের গাংনীর দুই বন্ধু সুমন ও আতিক। ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হন। গাংনী থেকে মেহেরপুর যাওয়ার পথে ফাঁকা সড়কে বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারায়। দুই বন্ধু দুদিকে ছিটকে পড়েন। হেলমেট থাকায় প্রাণে বাঁচলেও আঘাত গুরুতর। আঘাত নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন সুমন। তার বাম পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। আতিকের অবস্থা আরও ভয়াবহ।

ঈদের ছুটিতে রাজধানীর ফাঁকা সড়কে বাড়ে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি, যার বেশিরভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা, অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে প্রতিযোগিতা বা মহাসড়কে ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ—এসবই দুর্ঘটনার মূল কারণ। এজন্য ঈদের সময় বেপরোয়া বাইক না চালাতে তরুণদের আহ্বান জানিয়েছে নিটোর।

jagonews24

নিটোরের যুগ্ম পরিচালক মো. মোজাফফর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদের আগে-পরে ১৭৭ তরুণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সবার অবস্থা গুরুতর। অনেকের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন অনেক তরুণ আছেন, যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমি বলব, ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করবেন না। ফাঁকা সড়ক পেলেই গতি বাড়িয়ে মোটরসাইকেল চালাবেন না। মাথা ঠান্ডা রেখে চালান।’