Image description

সিএনএনের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বোমা হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় দেশটির বিরোধী দলগুলোকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।

শুক্রবার গভীর রাতের এ নাটকীয় ঘটনার পর ভেনেজুয়েলার বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী এবং ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো মন্তব্য করেন, ‘ভেনেজুয়েলাবাসী, স্বাধীনতার মুহূর্ত সমাগত।’

কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে মাচাদোর প্রতি তেমন আগ্রহ দেখাননি। মাচাদোর বদলে তিনি মাদুরোর অনুগত ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। রদ্রিগেজই এখন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

ট্রাম্পের এমন মনোভাব প্রকাশের পর ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় অফিশিয়াল চ্যানেলগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় নীরব ছিল।

রদ্রিগেজ নিজেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন। তিনি এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। শনিবার টেলিভিশনে রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট।

মাচাদো ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেস উররুতিয়াকে অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিতে এবং ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীকে তাঁর অনুগত থাকতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। অধিকাংশ পশ্চিমা সরকার গোনসালেসকেই ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে প্রকৃত বিজয়ী বলে মনে করেন।

মাচাদো বলেছিলেন, ‘আমরা আজ আমাদের ম্যান্ডেট (জনগণের রায়) কার্যকর করতে এবং ক্ষমতা নিতে প্রস্তুত। গণতান্ত্রিক উত্তরণ অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সতর্ক, সক্রিয় এবং সংগঠিত থাকতে হবে। এই উত্তরণে আমাদের সবাইকে প্রয়োজন।’

মাচাদোর মন্তব্যের পরপরই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে নিজের বিলাসবহুল রিসোর্ট মার-এ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন। সেখানে মাদুরো-পরবর্তী সরকারে মাচাদোর কোনো ভূমিকা থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, তিনি মাচাদোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।

ট্রাম্প আরও বলেন, মাচাদো একজন ‘খুব ভালো নারী’। কিন্তু ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ‘দেশের ভেতরে তাঁর সেই সমর্থন বা সম্মান নেই’।

গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাচাদো বা গোনসালেস—দুজনের কেউ ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাননি। মাচাদো ও গোনসালেসের টিমের সঙ্গে সিএনএনের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দিদশায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। হোয়াইট হাউসের প্রকাশ করা ভিডিও থেকে নেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দিদশায় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। হোয়াইট হাউসের প্রকাশ করা ভিডিও থেকে নেওয়াছবি: রয়টার্স

যেকোনো অনুগত সরকারই যথেষ্ট

মাচাদোর প্রতি ট্রাম্পের শীতল আচরণ অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ, এ বিরোধী নেত্রী ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক। এমনকি তিনি তাঁর নোবেল পুরস্কারটি পর্যন্ত ট্রাম্পকে উৎসর্গ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনে মাদুরো ‘কারচুপি’ করে ট্রাম্পকে হারিয়েছিলেন।

তবে কারাকাসভিত্তিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী সংস্থা ‘ওরিনোকো রিসার্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইলিয়াস ফেরার জানান, ট্রাম্পের আচরণে তিনি অবাক হননি। তাঁর মতে, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাচাদোকে খুব একটা পাত্তা দেন না।

ফেরার সিএনএনকে বলেন, তাঁর ধারণা, ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২০২১) ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন। তখন তাঁর প্রশাসন দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির হুয়ান গুয়াইদো নামের এক রাজনীতিবিদকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিলেন।

মাচাদো একজন খুব ভালো নারী। কিন্তু ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দেশের ভেতরে তাঁর সেই সমর্থন বা সম্মান নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে

তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬০টির বেশি দেশ গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তাঁর আন্দোলন দ্রুত মুখ থুবড়ে পড়েছিল।

ফেরার বলেন, ‘গুয়াইদোকে সমর্থন দিয়ে ট্রাম্প বিপদে পড়েছিলেন। কারণ, তিনি যে লোকটিকে সব জায়গায় তুলে ধরছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিলেন।’

এ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের মূল আগ্রহ—অপরাধ দমন, মাদক পাচারকারীদের নৌকা ধ্বংস এবং ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

ফেরার বলেন, ‘এসব কাজ করার জন্য আপনার আদর্শ গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। আপনার শুধু এমন একটি সরকার দরকার, যারা কোনো না কোনোভাবে আপনার অনুগত।’

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের মূল আগ্রহ—অপরাধ দমন, মাদক পাচারকারীদের নৌকা ধ্বংস এবং ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। এসব কাজ করার জন্য আপনার আদর্শ গণতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। আপনার শুধু এমন একটি সরকার দরকার, যারা কোনো না কোনোভাবে আপনার অনুগত।
ইলিয়াস ফেরার, প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, ওরিনোকো রিসার্চ

‘গণতন্ত্র’ শব্দটি অনুচ্চারিত

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নিউ অরলিন্সের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ভেনেজুয়েলা বিশেষজ্ঞ ডেভিড স্মাইল্ড সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি একবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি। এটা দেখে তিনি অবাক হয়েছেন।

স্মাইল্ড বলেন, ‘তাঁদের (ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের) মাথায় গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁদের মাথায় এমন একটি দেশ আছে, যেটি স্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল এবং মার্কিন স্বার্থের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হবে।’

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজছবি: রয়টার্স

স্মাইল্ড যোগ করেন, ‘এ মুহূর্তে গণতন্ত্র বা মারিয়া কারিনা মাচাদো—কেউ-ই তাঁদের পরিকল্পনায় আছে বলে মনে হচ্ছে না।’

সিএনএন এ বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাদুরোকে সরিয়ে যদি তাঁদের কাউকে বা দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা হয়, তাহলে আমাদের কী লাভ? আমি এর কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।
ভেনেজুয়েলার একজন বাসিন্দা

রদ্রিগেজ কি ‘ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করবেন’

মাচাদোর পরিবর্তে ট্রাম্পের নজর এখন ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের ওপর।

শনিবার ট্রাম্প বলেছেন, একটি ‘সুষ্ঠু উত্তরণ’ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। তিনি দাবি করেন, ‘ভেনেজুয়েলাকে আবার মহান করার জন্য যা যা প্রয়োজন, (রদ্রিগেজ) তা করতে ইচ্ছুক।’

রদ্রিগেজ নিজেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন। তিনি এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। শনিবার টেলিভিশনে রদ্রিগেজ জোর দিয়ে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট।

রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা আর কখনো কারও উপনিবেশ হব না।’ এ সময় তাঁর সঙ্গে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছিলেন। এসব কর্মকর্তার মধ্যে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলো অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি মাদুরোর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার আরও যেসব রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, তাঁদের মধ্যে ক্যাবেলোও রয়েছেন।

তাঁদের (ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের) মাথায় গণতান্ত্রিক উত্তরণের কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁদের মাথায় এমন একটি দেশ আছে, যেটি স্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল এবং মার্কিন স্বার্থের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ হবে।
ডেভিড স্মাইল্ড, অধ্যাপক, টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

কারাকাসের একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএনকে বলেন, মাদুরোকে সরিয়ে রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখাটা তাঁর কাছে ‘খুবই অদ্ভুত’ মনে হচ্ছে।

ওই বাসিন্দা বলেন, ‘মাদুরোকে সরিয়ে যদি তাঁদের কাউকে বা দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় রাখা হয়, তাহলে আমাদের কী লাভ? আমি এর কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।’