Image description

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি। ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলার মুখে রিয়াদ এই চুক্তির সামরিক কার্যকারিতা সক্রিয় করেছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব শুধু নিজের ভূখণ্ড রক্ষার জন্য নতুন সহযোগী জোগাড় করছে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলারও চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগে ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত রিয়াদের বৃহত্তর কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। দ্য ক্রেডেলে লেখা মালেক আল-খুরিরির এক বিশ্লেষণ, এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৫ অক্টোবর রিয়াদে মক্কা চুক্তির কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক সপ্তাহ আগেই এই কমিটির প্রথম বৈঠক হয়েছিল। এবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কার সাফা প্রাসাদে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, তিন দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা এবং এর জন্য দায়ীদের মোকাবিলায় যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় করতে সম্মত হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতেও প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। এর আওতায় সম্মত সামরিক সক্ষমতা ও বাহিনী সরবরাহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সৌদি আরবে মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও অনুমোদিত ব্যবস্থার অধীন থাকবে।

বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ-সমর্থিত সশস্ত্র বাহিনী সৌদি বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছিল। ফলে চুক্তি সক্রিয় করার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ইয়েমেনের যুদ্ধ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ‘হামলার জন্য দায়ীদের’ বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যার সুযোগ রাখে। সৌদি আরবের জন্য এই অস্পষ্টতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রিয়াদ একদিকে নিজের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে ইয়েমেনের যুদ্ধকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি বৃহত্তর সংঘাতে রূপ দেওয়ার ঝুঁকিও এড়াতে চায়।

মক্কা চুক্তির পেছনে রয়েছে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে আগে থেকে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব-পাকিস্তান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর কয়েক দিন আগে ইসরায়েল দোহায় হামলা চালিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সাফা প্রাসাদে ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল নীতি হলো, কোনো একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

 

তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের বিশ্লেষকদের মতে, এতে কোনো যৌথ সামরিক কমান্ড, স্থায়ী বাহিনী কিংবা কোন পরিস্থিতিতে যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যকর হবে, তার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। পরে চুক্তির অধীনে একটি সচিবালয় গঠিত হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদ। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, চুক্তিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অর্জন করেনি। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর হামলার পর এর কার্যকর ভূমিকা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই চুক্তির সামরিক তাৎপর্য বুঝতে হলে পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ৫ অক্টোবর জিও টিভিকে বলেন, পাকিস্তানি ও তুর্কি বাহিনী সৌদি আরবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারিসহ সহায়তামূলক দায়িত্ব পালন করছে। আর সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনা করছে সৌদি বাহিনী। এর তিন দিন আগে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছিলেন, চুক্তিটি আত্মরক্ষামূলক এবং এর কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য নেই। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখা হবে। দেশটির সামরিক বাহিনী সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করলেও তাদের সংখ্যা ও নির্দিষ্ট দায়িত্ব প্রকাশ করেনি।

ইয়েমেনে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনও পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায়, প্রতিবেদনটি ‘ভুয়া ও বানোয়াট’। এই অস্বীকৃতির গুরুত্ব শুধু সামরিক উপস্থিতির প্রকৃতি নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তান একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় এবং ইরানের সঙ্গে তার কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রাখতে চায়। ইয়েমেনে সরাসরি হামলায় অংশ নিলে এই দুই লক্ষ্য পরস্পরের বিরোধী হয়ে উঠতে পারে।

তুরস্কের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশটির সংবিধানের ৯২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে সেনা পাঠাতে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। মক্কা চুক্তি এখনো তুরস্কের সংসদে অনুমোদিত হয়নি। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ৮ অক্টোবর বলেছেন, সৌদি আরবকে সহায়তা করার বিষয়টি আঙ্কারা বিবেচনা করছে, তবে ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য তুর্কি সেনা পাঠানো হবে না। ফলে রিয়াদ তার দুই নতুন অংশীদারের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পেলেও তাদের সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্ত করতে পারছে না। এই সীমারেখা চুক্তিটির কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক যুদ্ধের বিস্তৃতি সম্পর্কে তার নিজস্ব মূল্যায়ন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া, উপসাগরীয় নৌপরিবহনে ইরানের চাপ এবং বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে সৌদি আরব। কিন্তু রিয়াদ এই সংঘাতকে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো যুদ্ধে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে দেখেনি। বরং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সামলানো, নিজের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখা এবং সংঘাতের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখাই তার অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

এই অবস্থানের পেছনে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। ৪ অক্টোবর ইরান জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তার শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে। ৮ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল থাকবে। একই দিনে তেহরান জানায়, ওয়াশিংটনের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব তারা পর্যালোচনা করছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার চেয়ে নিজের নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং কূটনৈতিক বিকল্প খোলা রাখা বেশি বাস্তবসম্মত।

ইয়েমেনের যুদ্ধ অবশ্য রিয়াদের জন্য ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠেছে। ১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ-সমর্থিত বাহিনী লোহিত সাগরের মোখা বন্দর দখল করে এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি অগ্রসর হয়। সানার কর্তৃপক্ষ বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে জানায়, সৌদি আকাশসীমা তাদের সামরিক কার্যক্রমের আওতায় পড়ে; তবে মক্কা ও মদিনার আকাশসীমাকে এর বাইরে রাখা হয়। এরপর সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা এবং জাজান ও নাজরান বিমানবন্দরে হামলার খবর সামনে আসে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত তিনজন আহত হন।

৮ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় একজন পাইলটসহ তিনজন নিহত হন বলে সৌদি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানায়। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী দাবি করে, তাদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। ১০ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে আরেকটি হামলায় সৌদি কর্তৃপক্ষের হিসাবে ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। ১১ অক্টোবরের আরেক হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় সৌদি আরবের ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপও বেড়েছে।

মক্কা চুক্তির যৌথ বিবৃতিতে মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্যবস্তু করার কথিত প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছে। তবে সানার কর্তৃপক্ষ এই দুই পবিত্র নগরীকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই পাল্টাপাল্টি দাবির মধ্যেই চুক্তির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে কি না এই ব্যবস্থা, নাকি ইয়েমেনে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযানের পথ তৈরি করবে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। সৌদি-সমর্থিত ইয়ামেনি বাহিনী মোখা পুনর্দখলের দাবি করলেও সানা তা অস্বীকার করেছে। সৌদি অভিযানে ধুবাবের আশপাশে অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও মোখা এখনো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রয়ে গেছে।

 

এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবকে সমর্থন দিচ্ছে, যদিও সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। ৫ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, হুতিদের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি সামরিক কার্যক্রম পরিচালনাকেন্দ্রে প্রায় ২০০ মার্কিন উপদেষ্টা কাজ করছেন। অর্থাৎ, রিয়াদ নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদার গড়ে তুললেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার নিরাপত্তা সহযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি। বরং সৌদি আরব একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহযোগিতা এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত সীমিত রাখার চেষ্টা করছে।

তবে মক্কা চুক্তির সক্রিয়তা তেহরানে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ইরানের আপত্তি স্পষ্ট। রিয়াদের বৈঠকের এক দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছিল, ইয়েমেনে যুদ্ধ করতে পাকিস্তানি বাহিনী মোতায়েনের খবর সত্য নয়। তাদের আশঙ্কা, পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে সংঘাত আরও জটিল হবে। চুক্তি সক্রিয় হওয়ার পর ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম একে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের যুদ্ধে তুরস্ক ও পাকিস্তানের যোগদান হিসেবে তুলে ধরে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ঘনিষ্ঠ নূর নিউজও প্রশ্ন তোলে, এটি মক্কার জোট, নাকি ইয়েমেনের নিপীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে জোট।

কিন্তু ইরানের প্রকৃত আপত্তির সীমা সম্ভবত বক্তব্যের চেয়ে নির্দিষ্ট। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানি গবেষক জাভাদ হেইরানিয়া বলেন, সৌদি স্থাপনা রক্ষায় পাকিস্তানের সীমিত প্রতিরক্ষামূলক মোতায়েন ইরান সহ্য করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিলে তা ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করবে। তার মতে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা এখন আর নিছক নিরপেক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরস্পরবিরোধী স্বার্থ সামলানোর দায়িত্বও এতে যুক্ত হয়েছে।

এখানেই পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা। সৌদি আরবের শহর ও স্থাপনাগুলো ঘিরে একটি প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তাবলয় তৈরি হলে ইসলামাবাদ একই সঙ্গে রিয়াদ ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে। কিন্তু ইয়েমেনে পাকিস্তানি বিমান হামলা হলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান হামলার প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি নিছক সংবাদগত বিতর্ক নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত।

সৌদি আরবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা। ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে গত বছর দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর ৫ অক্টোবরের ছয় দিন আগে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান রিয়াদে আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে স্বাগত জানান। সৌদি প্রেস এজেন্সি জানায়, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গত বছরের ইয়েমেন-সংক্রান্ত বিরোধের পর এটিই ছিল আমিরাতের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রথম সফর।

এই বৈঠক থেকে ইয়েমেন নিয়ে নতুন যৌথ পরিকল্পনার ঘোষণা আসেনি। তবু এর সময় গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে রিয়াদ আবুধাবির সঙ্গে আবার সমন্বয় বাড়াতে চাইছে। কিন্তু নিজের সামরিক অভিযানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে আগ্রহী। অন্যদিকে মক্কা চুক্তির সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কও জটিল। ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের গবেষকদের মতে, চুক্তিটিকে অনেকে আব্রাহাম চুক্তির প্রতি একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। এটি আমিরাতের পছন্দের ভারত-ইসরায়েল-আমিরাত কৌশলগত ত্রিভুজের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই রিয়াদ আপাতত ত্রিপক্ষীয় জোটে আবুধাবিকে যুক্ত না করেই ইয়েমেন প্রশ্নে তার সহযোগিতা চায়।

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের প্রশ্নেও একই ধরনের সীমারেখা রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের সহকারী পাইলট বিমানের ক্যাপ্টেনের ওপর হামলা করলে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে হামলার ঘটনা নিশ্চিত করা হয় এবং আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেন। বিমানে থাকা ১৭২ জন যাত্রীর প্রায় সবাই ছিলেন ইসরায়েলি।

ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে ওঠে। দ্য জেরুজালেম পোস্ট সৌদি আরবের সহায়তা এবং আমিরাতের ফিরতি ফ্লাইটকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক সম্পর্কের বাস্তব উপযোগিতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। আল-আরাবি আল-জাদিদ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনের আগে ঘটনাটি ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করে। অন্যদিকে টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর বিরোধীদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা টানার কথা বলা হয়।

সৌদি আরব জরুরি অবতরণের পর বিমানের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যবস্থা নেয় এবং আমিরাতের ফৌজদারি তদন্তের পাশাপাশি বিমান চলাচলের নিরাপত্তা তদন্ত শুরু করে। কিন্তু রয়টার্সের উদ্ধৃত নিরাপত্তা সূত্র অনুযায়ী, যাত্রীদের ফিরিয়ে নিতে ইসরায়েলি বিমান পাঠানোর অনুরোধ সৌদি আরব প্রত্যাখ্যান করে। ঘটনাটি থেকে বাস্তব পরিস্থিতিতে সহযোগিতার নজির পাওয়া গেলেও তা তেল আবিবের সঙ্গে সৌদি আরবের রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো পদক্ষেপে রূপ নেয়নি। অর্থাৎ, মানবিক ও নিরাপত্তাগত দায়িত্ব পালনের সঙ্গে কূটনৈতিক স্বীকৃতির প্রশ্নকে রিয়াদ আলাদা করে দেখছে।

এর কেন্দ্রে রয়েছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি শুরা কাউন্সিলে মোহাম্মদ বিন সালমান স্পষ্ট করেছিলেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হলে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না সৌদি আরব। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের একটি বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রিয়াদের দাবি সুস্পষ্ট ও আপসহীন।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবে সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যেত। কিন্তু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সেই সম্ভাবনাকে আরও জটিল করেছে। লিকুদ পার্টির নির্বাচনী পোস্টারে ভোটারদের সামনে ‘ডানপন্থা অথবা ফিলিস্তিন’—এমন বিকল্প তুলে ধরা হয়েছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে নির্বাচনী প্রচার চালানো কোনো সরকারের পক্ষে সৌদি আরবের প্রকাশ্য শর্ত পূরণ করা কঠিন। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছু যোগাযোগ থাকলেও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে মৌলিক বাধা রয়ে গেছে।

মক্কা চুক্তি সৌদি আরবের বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সিরিয়া। মিডিল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ২৮ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা আঞ্চলিক দেশগুলোকে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তোলার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সৌদি আরবের আরার থেকে জর্ডান হয়ে সিরিয়ার উপকূল পর্যন্ত উচ্চগতির রেলপথ নির্মাণের প্রস্তাব, জর্ডান-তুরস্ক-সিরিয়ার স্থলপথ করিডর সমন্বয় কমিটি, আকাবা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত হেজাজ রেলপথ পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা এবং সৌদি-তুর্কি রেল যোগাযোগের উদ্যোগ এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।

এর পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে তারতুস বন্দরের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং সিল্ক লিংক টেলিযোগাযোগ প্রকল্প রয়েছে। সিল্ক লিংকের প্রথম পর্যায়ে সৌদি বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের বিলম্ব সর্বোচ্চ ৪০ মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত কমানো হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দামেস্ক অন্তত ২৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি তেল রপ্তানির এক-চতুর্থাংশের বেশি ছিল সিরিয়ার অংশ। এসব পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো, রেল ও স্থলপথের মতো অবকাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই সিরিয়াকে ঘিরে পুঁজি ও বাণিজ্যের প্রবাহ বাড়ছে। অর্থাৎ, আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি যোগাযোগ ও বাণিজ্যপথের বিকল্প তৈরি করাও সৌদি আরবের কৌশলগত চিন্তার অংশ।

ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন এই নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে লিকুদ ও ইয়াশারের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেলেও বিভিন্ন জরিপে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত ও ট্রাম্পের সাময়িক বিরতির সিদ্ধান্তও নির্বাচনী বিতর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। কারণ, ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা আপাতত স্থগিত রাখার যে অবস্থান নিয়েছে, তার মধ্যেই রিয়াদ নিজের কূটনৈতিক পরিসর ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে মক্কা চুক্তি নিয়ে উদ্বেগও দেখা গেছে। চুক্তি সক্রিয় হওয়ার পর ইসরায়েল সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নথিভুক্ত না হলেও চ্যানেল ১৪-এর তামির মোরাগ ৬ অক্টোবরের এক লেখায় বিষয়টিকে ইসরায়েলের জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে বর্ণনা করেন। তার আশঙ্কা, এর ফলে তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতায় নতুন নজির তৈরি হতে পারে। এর আগে আগস্টে ইয়েদিওত আহরোনোত বা ইয়েনেট-এ উদ্ধৃত এক অনামা জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা চুক্তিটিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের একটি বিশ্লেষণে রিয়াদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঙ্কারার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য অংশীদার সৌদি আরব ইতিমধ্যে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে তুরস্ককে ক্রমেই কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। ফলে নেতানিয়াহুর ঘোষিত আঞ্চলিক পরিকল্পনা এবং সৌদি আরবের বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। এই ব্যবধানের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনো সহযোগিতাই সম্ভব নয়; বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদ তার নিরাপত্তাব্যবস্থা এমনভাবে সাজাচ্ছে, যেখানে ইসরায়েল অপরিহার্য অংশীদার নয়।

তবে মক্কা চুক্তিকে এখনই ‘ইসলামি ন্যাটো’ হিসেবে দেখা অতিরঞ্জিত হবে। তিন সদস্যের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এক নয়। তুরস্কের মনোযোগ সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে, পাকিস্তানের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ ভারতকে ঘিরে, আর সৌদি আরবের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা। তুরস্কের সংসদীয় অনুমোদন এখনো বাকি, পাকিস্তানের মোতায়েনের বিস্তারিত গোপন রাখা হয়েছে এবং সৌদি আরবের সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা দেখায়, চুক্তিটি এখনো কোনো একক, সমন্বিত আঞ্চলিক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়নি।

তবু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সৌদি আরবের ওপর হামলার মুখে রিয়াদ প্রথমবারের মতো নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। সে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহায়তা চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রেখেছে এবং ইরানের সতর্কবার্তাও বিবেচনায় নিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর বাইরে রেখেছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের কৌশলগত অগ্রাধিকার স্পষ্ট হচ্ছে: নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, কিন্তু তার জন্য এমন কোনো যুদ্ধে জড়ানো যাবে না, যা আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করবে কিংবা কূটনৈতিক বিকল্পগুলো বন্ধ করে দেবে।

মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ভারসাম্য কতটা ধরে রাখা যায় তার ওপর। পাকিস্তান ও তুরস্ক যদি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিয়েও ইয়েমেনে সরাসরি আক্রমণ থেকে দূরে থাকতে পারে, তাহলে চুক্তিটি সীমিত কিন্তু কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে। অন্যদিকে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার নামে অংশীদারদের ইয়েমেনের যুদ্ধে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা হলে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়বে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা দুর্বল হতে পারে। তুরস্কের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ও সদস্যদের ভিন্ন নিরাপত্তা অগ্রাধিকারও যৌথ সামরিক পদক্ষেপের পরিধি সীমিত করবে।

সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তি শুধু তিন দেশের সামরিক সহযোগিতার ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা, কূটনীতি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক স্বার্থের পুনর্বিন্যাসের একটি লক্ষণ। সৌদি আরব একদিকে ইয়েমেন থেকে আসা হামলা মোকাবিলা করছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলেছে। একই সময়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে, আমিরাতের সঙ্গে সমন্বয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং সিরিয়াকে ঘিরে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরির উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্নেও রিয়াদ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। এই সব পদক্ষেপের সম্মিলিত বার্তা হলো, সৌদি আরব এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শুধু ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের হিসাবের ওপর নির্ভর করতে চায় না। ইসরায়েলে ২৭ অক্টোবর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, তাকে এমন এক সৌদি নিরাপত্তাব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, যার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ইতিমধ্যে সক্রিয় হওয়ার পথে। তবে এই নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হবে ঘোষণায় নয়, বরং সদস্যরা কতটা সমন্বয় করতে পারে এবং যুদ্ধকে সীমিত রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে তার ওপর।