আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় তিন সপ্তাহের বেশি বিক্ষোভ চলছে। শুরুতে একটি উপকূলীয় বিলাসবহুল রিসোর্টকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়। এখন তা দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে। খবর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের।
গত ৩০ মে বিক্ষোভ হয়। সেদিন দক্ষিণ আলবেনিয়ার একটি সৈকতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, এক বিক্ষোভকারীকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিচ্ছে নিরাপত্তারক্ষীরা। ওই সৈকতটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পরিকল্পিত বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্পের অংশ।
৪০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে কুশনারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিনিয়োগকারীরাও যুক্ত। প্রকল্পে জভেরনেক এলাকার উপকূল এবং কাছের সাজান দ্বীপকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সংরক্ষিত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে প্রকল্পের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভের জেরে সরকার সংশ্লিষ্ট দুটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে। স্থানীয় পুলিশপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বেড়া খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও বিক্ষোভ থামেনি।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিরানার কেন্দ্রীয় সড়কে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করছেন। তাদের হাতে দেখা যায়, ‘আলবেনিয়া বিক্রির জন্য নয়’ লেখা ব্যানার। আন্দোলনটি ইতোমধ্যে ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ, প্রকল্প এলাকা সমৃদ্ধ পাখির আবাসস্থল।
সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনটি নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বামপন্থী আন্দোলনকে ট্রাম্প পরিবার ও ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখছেন। আবার ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী এটিকে ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
যদিও বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ট্রাম্প বা ইসরায়েল নয়। তাঁরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এলিস কোদ্রা বলেন, কমিউনিজমের পতনের পর তিন দশকের বেশি একই ধরনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশ পরিচালনা করছে। সাধারণ মানুষের সমস্যার চেয়ে তারা নিজেদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই কারণে আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী এদি রামা এবং বিরোধী নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী সালি বেরিশা। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, রামাকে জেলে পাঠাও, বেরিশাকেও জেলে পাঠাও।
প্রধানমন্ত্রী রামার দাবি, এই আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ট্রাম্পবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলন নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারা চালানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্দোলনটি ট্রাম্প বা কুশনারবিরোধী নয়, বরং এটি আলবেনিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
আলবেনিয়া ইউরোপের অতিদরিদ্র দেশগুলোর অন্যতম। জনসংখ্যাও ৩০ লাখের কম। তবে দেশটি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সে কারণে স্থানীয় একটি ইস্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে।
আন্দোলনকারী বাকি গোকসাজ বলেন, এই আন্দোলন ট্রাম্প বা ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়। এটি দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।
আন্দোলনের পেছনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধও ভূমিকা রাখছে। কমিউনিস্ট আমলে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি ফেরত পেতে বহু পরিবার আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের দাবি, বিতর্কিত প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অবশ্য এতকিছুর মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী রামা স্পষ্ট জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু কুশনারের বিলাসবহুল রিসোর্ট প্রকল্প বাতিল করা হবে না। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত