Image description

পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল চালকের। কয়েক শ মিটার নিচে সবুজ জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে চলেছে নদী। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি এমন এক সরু সড়কে, যেখানে চালকের একটি সামান্য ভুল মানেই শেষ যাত্রা। পৃথিবীতে অনেক ভয়ংকর রাস্তা আছে, কিন্তু এমন রাস্তা খুব কমই আছে, যার নামই হয়ে গেছে ‘মৃত্যুসড়ক’।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার উত্তর ইয়াংগাস সড়ক বহু বছর ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়কগুলোর তালিকায় রয়েছে। একসময় প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের প্রাণ যেত এখানে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কারণে স্থানীয়রা পথটিকে ডাকতে শুরু করেন কামিনো দে লা মুয়ের্তে অর্থাৎ মৃত্যুসড়ক।

বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজ থেকে শুরু হয়ে সড়কটি নেমে গেছে করোইকো শহরের দিকে। শুরুতেই পথ উঠে যায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ৬৫০ মিটার উচ্চতার লা কুমব্রে গিরিপথে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ও বিপজ্জনক অবতরণ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা নেমে আসে প্রায় এক হাজার দুইশ মিটার উচ্চতায়। এত অল্প দূরত্বে তিন হাজার মিটারেরও বেশি উচ্চতা কমে যাওয়াই এ পথকে অন্য সব পাহাড়ি রাস্তা থেকে আলাদা করেছে।
পৃথিবীর নানা দেশ থেকে রোমাঞ্চপ্রেমীরা এখানে আসেন পাহাড়ি সাইকেল চালাতেরাস্তার বেশির ভাগ অংশ এতটাই সরু যে বিপরীত দিক থেকে দুটি বড় বাস এলে চালকদের একজনকে প্রায় খাদঘেঁষে বাস দাঁড় করিয়ে অন্যটিকে আগে যেতে দিতে হয়। কোথাও কোথাও রাস্তার প্রস্থ সাড়ে তিন মিটারেরও কম। এক পাশে খাড়া পাথরের দেয়াল, অন্য পাশে প্রায় ছয়শ মিটার গভীর খাদ। অনেক অংশে আজও কোনো নিরাপত্তা রেলিং নেই।

এই পথের ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে চাকো যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দিদের শ্রমে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছিল সড়কটির বড় অংশ। সে সময় পাহাড়ের বুক চিরে এমন রাস্তা নির্মাণ ছিল প্রকৌশলীদের জন্যও বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই কঠিন নির্মাণকাজের মূল্য আজও দিচ্ছেন পথ ব্যবহারকারীরা।

প্রকৃতিও যেন এই রাস্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। পূর্ব দিক থেকে আসা আর্দ্র বাতাস আন্দিজ পর্বতমালায় আটকে গিয়ে প্রায় সারা বছরই সৃষ্টি করে ঘন কুয়াশা ও বৃষ্টি। মুহূর্তেই সামনে কয়েক মিটারের বেশি দেখা যায় না। ভেজা কাদামাটি, পিচ্ছিল রাস্তা আর পাহাড়ধসের ঝুঁকি চালকদের প্রতিটি মুহূর্তকে করে তোলে অনিশ্চিত। কোথাও পাহাড়ের ওপর থেকে ছোট ছোট জলপ্রপাত সরাসরি রাস্তার ওপর পড়তে থাকে। আবার কোথাও হঠাৎই গড়িয়ে আসে বিশাল পাথর।

এ পথের একটি অদ্ভুত নিয়ম বহুদিন ধরেই আলোচনায়। বলিভিয়ার প্রায় সব সড়কে গাড়ি চলে ডান পাশে। কিন্তু উত্তর ইয়াংগাস সড়কে চালকদের বাম পাশে চলতে বলা হতো। কারণ চালক তখন খাদঘেঁষা অংশটি নিজের চোখে স্পষ্ট দেখতে পারেন এবং বিপরীত দিকের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সহজ হয়। পাহাড়ি সড়কের জন্য এই নিয়ম কার্যকর বলেই মনে করেন অনেক অভিজ্ঞ চালক।
একসময় মৃত্যুসড়কের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো নিয়মিত এ রাস্তার দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করত। বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে প্রতি বছর শতাধিক মানুষ এখানে প্রাণ হারাতেন। অনেক বাস ও ট্রাক খাদে পড়ে একসঙ্গে বহু যাত্রীর মৃত্যু ঘটেছে। আজও রাস্তার পাশে ছোট ছোট কাঠের ক্রুশ চোখে পড়ে। সেগুলো কোনো পর্যটন সাজসজ্জা নয়; প্রতিটি একেকটি দুর্ঘটনার নীরব স্মৃতি।

তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। দুই হাজার ছয় সালের পর ধাপে ধাপে নির্মাণ শুরু হয় নতুন পাহাড়ি মহাসড়ক। দুই হাজার নয় সালের দিকে সেটি সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হলে অধিকাংশ বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক নতুন পথ ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে পুরোনো ইয়াংগাস সড়কে যানবাহনের চাপ অনেক কমে যায়। পরে পুরোনো রাস্তার বিভিন্ন অংশেও নিরাপত্তা উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং কিছু জায়গায় সুরক্ষাব্যবস্থা যোগ করা হয়।

তাই আজ আর একে আগের মতো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সড়ক বলা হয় না। তবু বিপদ যে পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে, তা নয়। পাহাড়ধস, কুয়াশা, বৃষ্টি এবং অসাবধানতা এখনো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় মানুষ, কৃষিশ্রমিক এবং কিছু মোটরসাইকেল আরোহী নিয়মিত এ পথ ব্যবহার করেন।
বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজ থেকে শুরু হয়ে সড়কটি নেমে গেছে করোইকো শহরের দিকেএখন মৃত্যুসড়কের নতুন পরিচয় তৈরি হয়েছে। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে রোমাঞ্চপ্রেমীরা এখানে আসেন পাহাড়ি সাইকেল চালাতে। লা কুমব্রে থেকে করোইকো পর্যন্ত প্রায় চৌষট্টি কিলোমিটার দীর্ঘ উঁচু-নিচু পথ সাইকেলে নামা অনেকের কাছে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে এই আনন্দও ঝুঁকিমুক্ত নয়। গত দুই দশকেও কয়েকজন সাইকেল আরোহী দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাই নিরাপত্তা সরঞ্জাম, অভিজ্ঞ গাইড এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে চলা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন সড়ক চালু হওয়ার আরেকটি অপ্রত্যাশিত সুফল পেয়েছে প্রকৃতি। যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শব্দ ও বায়ুদূষণও কমেছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা গবেষকেরা ক্যামেরা বসিয়ে দেখেছেন, আশপাশের বনাঞ্চলে স্তন্যপায়ী প্রাণী ও নানা প্রজাতির পাখির উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। যে রাস্তা একসময় মৃত্যুর প্রতীক ছিল, তার আশপাশেই আবার প্রাণের ফিরে আসার গল্পও লেখা হচ্ছে।


সূত্র: এটলাস অবসকিউরা, বিবিসি ট্রাভেল, রয়টার্স, বলিভিয়া ট্যুরিজম, ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি