দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। এ ঈদের অন্যতম বিধান হলো সামর্থবান মুসলিমদের কোরবানি করা। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত বিশাল ধুলাগড় গরুর হাটে এখনও কেনাবেচা শুরু হয়নি। হাটটি এখন ক্রেতাশূন্যতায় হাহাকার করছে।
সোমবার (২৫ মে) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাটে টিনের ছাউনির নিচে দল বেধে বসে আছেন ব্যবসায়ীরা। বিক্রির জন্য আনা ২০০টিরও বেশি গরু প্রচণ্ড গরমের মধ্যে খোলা জায়গায় বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হাটে কোনো ক্রেতার দেখা মিলছে না।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা থেকে আসা এক হিন্দু বিক্রেতা আল জাজিরাকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে গরু কেনার জন্য তিনি উচ্চ সুদে একাধিক ঋণ নিয়েছেন। প্রায় আড়াই কোটি মুসলিম অধ্যুষিত পশ্চিমবঙ্গে এ সময় সাধারণত জমজমাট ব্যবসার মৌসুম থাকে। অঞ্চলটির মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী।
তিনি বলেন, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গরু কিনবে কে? মানুষ এখন ভয়ে আছে।
দশকের পর দশক ধরে ধুলাগড়ের এ গরুর হাটে ঈদুল আজহার কোরবানির প্রস্তুতির জন্য হিন্দু বিক্রেতা ও মুসলিম ক্রেতাদের সমাগম হতো। ছাগল বা ভেড়ার পাশাপাশি অনেক মুসলিম পরিবার একসঙ্গে অর্থ জোগাড় করে গরু, মহিষ বা উট কোরবানি দিত এবং সাত ভাগে মাংস ভাগ করে নিত।
যদিও ১৯৫০ সালের একটি আইনে প্রকাশ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থি বা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তির শাসনে ছিল, যারা এ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেনি। ফলে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গ গরুর মাংস এবং বিভিন্ন মাংসজাত খাবারের জন্য পরিচিত খাদ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫০ সালের আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেন। ওই আইন অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া কোনো গরু জবাই করা যাবে না। জবাইয়ের উপযুক্ত পশুর জন্য সনদ থাকতে হবে। এছাড়া জবাই করতে হবে শুধুমাত্র পৌরসভার কসাইখানা বা প্রশাসন নির্ধারিত স্থানে। আইন অনুযায়ী, জবাইয়ের জন্য পশুর বয়স অন্তত ১৪ বছর হতে হবে।
ভারতের বহু হিন্দু গরুকে পবিত্র প্রাণী মনে করেন। ফলে দেশটির অধিকাংশ রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপি-সমর্থিত স্বঘোষিত ‘গরু রক্ষাকারী’ গোষ্ঠীগুলো গরুর মাংস বহন বা খাওয়ার অভিযোগে বহু মুসলিম ও হিন্দু গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিজেপির নির্বাচনী জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে গরুর মাংস বিক্রি কমে গেছে। মাংস বিক্রেতা, রেস্তোরাঁ মালিক ও রাস্তার খাবার বিক্রেতারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
কলকাতাভিত্তিক রেস্তোরাঁ ‘দ্য বার্গার শপ’ তাদের জনপ্রিয় বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ইনস্টাগ্রামে তারা লিখেছে, আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু রাজনীতির আছে।
রেস্তোরাঁটির ব্যবস্থাপক উৎসা আল জাজিরাকে বলেন, গত ১৪ মে আমরা জানতে পারি, আমাদের গরুর মাংস সরবরাহকারী দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। তাকে থানায় ডেকে সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল। দ্রুত অন্য সরবরাহকারীও পাইনি। তাই বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে। আমাদের নিয়মিত গ্রাহকেরা হতাশ, কারণ ব্যবসার বড় অংশই ছিল বিফ।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় দুটি মাংসের দোকানের মালিক ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ হাসিম বলেন, আমরা ৬০ বছর ধরে এ ব্যবসা করছি এবং বৈধ লাইসেন্সও আছে। এত বছর কলকাতায় থেকে সবসময় শান্তি দেখেছি। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি পুরো ওলটপালট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সরবরাহকারীরা ভয়ে আছে। ছোট হোটেল ও খাবারের দোকানগুলোও আর আগের মতো গরুর মাংস কিনছে না। এখন আমরা দুপুর দেড়টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাই। আগে রাত ৭টা পর্যন্ত বিক্রি হতো।
ধুলাগড় গরুর হাটে তিনজন হিন্দু বিক্রেতা নিজেদের আর্থিক দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের একজন বলেন, কিছু গরু বিক্রি করতে পারলেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। বিক্রি না হওয়া প্রতিটি গরুর জন্য প্রায় ৫ হাজার রুপি ক্ষতি হচ্ছে।
আরেক মুসলিম গরু ব্যবসায়ী জানান, ঈদের জন্য গরু কিনতে মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলাম। ঈদের সময় আমাদের পরিবার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি আয় করে। কিন্তু এবার আমার ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি হয়নি। এখন কী করব? আমি খুব চিন্তায় আছি।
তিনি আরও জানান, গত বছর তিনি প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন।
গরু জবাই নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপকে সমর্থন করে বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার আল জাজিরাকে বলেন, যে আইনগুলো আগে মানা হতো না, এখন সেগুলো কঠোরভাবে কার্যকর করা হচ্ছে।
ভারতের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সাবেক সদস্য ও আইনজীবী জয়সিমহা নগ্গেহাল্লি বলেন, ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করার আইনগুলোকে সাধারণত প্রাণী সুরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
তিনি বলেন, এসব আইনের গঠন ও বাস্তবায়ন আসলে পরিচয়, বাণিজ্য এবং গ্রামীণ জীবিকার প্রশ্নের সঙ্গে বেশি জড়িত। এটি সামগ্রিক প্রাণীকল্যাণ নীতির সঙ্গে নয়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে আমরা যা দেখছি, তা একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। বিভিন্ন রাজ্যে গরু ও মাংস নিয়ন্ত্রণ এখন রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে সেইসব রাজ্যে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।