Image description

সারা দেশে ২৫৮ আসনে প্রার্থী দিয়ে ১০টিতে জামানত টেকাতে পেরেছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। স্থগিত থাকা শেরপুর-৩ ছাড়া ২৪৭ আসনেই জামানত গেছে দলটির। জয় মিলেছে মাত্র একটি আসনে। অবশ্য ২০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন ১৮ প্রার্থী।

স্ট্রিমের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি আসন স্থগিত ধরে ২৫৭ আসনের মধ্যে বরিশাল বিভাগের চার জেলা—বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালি ও ভোলায় সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে দলটি। এর বাইরে কুড়িগ্রাম জেলায়ও তুলনামূলক বেশি ভোট পেয়েছে তারা। তবে এই পাঁচ জেলায় ভালো করার পরেও এর কোনো কোনো আসনে প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিতে হয়। কোনো প্রার্থীকে জামানত রক্ষা করতে হলে মোট প্রদত্ত ভোটের কমপক্ষে ৮ ভাগের এক ভাগ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। এর কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়।

এবারের সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থীকে কমিশনের অনুকূলে ৫০ হাজার টাকা করে জামানত জমা দিতে হয়েছে। এই হিসাব মতে, ২৪৭ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

জামানত টিকা ৮ আসন

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বদরুজ্জামান উজ্জ্বল (হাতপাখা) ৩২ হাজার ৫৮২ ভোট, ময়মনসিংহ-৮ আসনে শাহ্ নুরুল কবির শাহিন পেয়েছেন ৩২ হাজার ৭৩৪ ভোট, পিরোজপুর-৩ আসনে রুস্তম আলী ফরাজী পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৬৮ ভোট। এই তিনটিসহ বরগুনা-১, পটুয়াখালী-১, ৩, ৪, বরিশাল-৪, ৫, ৬—মোট এই ১০টি আসনে জামানত টিকেছে ইসলামী আন্দোলনের। এর মধ্যে বরগুনা-১ আসনে জয়লাভ করেছে দলটি।

পাঁচ জেলায় বেশি ভোট, সেখানেও জামানত বাজেয়াপ্ত ১১ প্রার্থীর

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম, বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালি ও ভোলা—এই পাঁচ জেলায় ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা দেশের অন্য জেলাগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভোটার টানতে পেরেছেন।

তবে বেশি ভোটার টানার পরেও কুড়িগ্রামের চার আসনের সব কটিতেই ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। বরগুনার একটি আসনে জয় পেলেও আরেকটি আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আর পটুয়াখালীর ৪ আসনের একটিতে জামানত হারিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের একজন প্রার্থী। ভোলার ৪ আসনের ৩টিতে প্রার্থী দিয়ে ৩টিতেই জামানত হারিয়েছে দলটি। অন্যদিকে বেশি ভোট পাওয়া জেলা বরিশালেও ৬ আসনের ৩টিতে জামানত হারিয়েছে হাতপাখা।

বেশি ভোট পেয়েও জামানত হারিয়েছেন যাঁরা

তুলনামূলক বেশি ভোট পেয়েও ইসলামী আন্দোলন যেসব প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছেন কুড়িগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ হারিসুল বারী রনি। আসনটিতে জামানত ধরে রাখতে অন্তত ৪৪ হাজার ২২৩ ভোট পাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু হাতপাখা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৮০৭ ভোট।

কুড়িগ্রাম-২ (সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট) আসনে মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ২টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৪৯ হাজার ২৫২ ভোট। আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নূর বখত হাতপাখায় পেয়েছেন ২৪ হাজার ৮২৯ ভোট।

কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০। আসনটিতে বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮১০। জামানত ফিরে পেতে প্রার্থীদের প্রয়োজন ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৯৭৬ ভোট। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. আক্কাছ আলী সরকার পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৫৭৮ ভোট।

কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী-রৌমারী-রাজীবপুর) আসনে মাত্র ৬ হাজার ২৩১ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের আরেক প্রার্থী হাফিজুর রহমান।

অন্যদিকে কুড়িগ্রামের চার আসনেই জয় পেয়েছে জামায়াত জোট। জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জামায়াতে ইসলামী ও একটিতে তাদের নির্বাচনী জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিজয়ী হয়েছে।

ভোলার চার আসনের তিনটিতে প্রার্থী দিয়ে প্রতিটিতেই জামানত হারিয়েছে দলটি। ভোলা-১ (সদর) আসনে হাতপাখা প্রতীকে ২৫ হাজার ২৪৫ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন মাওলানা ওবায়দুর রহমান, ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে ৭ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে মো. মোসলেহ উদ্দিন, ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে ২৪ হাজার ৯৩৫ ভোট পেয়ে আবুল মোকাররম মো. কামাল উদ্দিন জামানত হারিয়েছেন।

একমাত্র জয় বরগুনায়, সেখানেও জামানত বাজেয়াপ্ত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটিমাত্র আসন পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা-১ আসনে মো. অলি উল্লাহ হাতপাখা প্রতীকে ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন বিএনপির মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৫।

১৬ হাজার ৪৬৩ ভোট নিয়ে বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী-পাথরঘাটা) আসনে জামানত হারিয়েছেন হাতপাখার মো. মিজানুর রহমান। আসনটিতে জামানত ধরে রাখার জন্য ২৪ হাজার ৭৬৫ ভোট দরকার ছিল।

বরিশালেও জামানত ধরে রাখা যায়নি

বরিশালকে ইসলামী আন্দোলনের ঘাঁটি বলা হয়। কিন্তু সেখানেও জামানত খুইয়েছেন দলটির অর্ধেক প্রার্থীরা। যদিও দলের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীম নির্বাচন করায় তুলনামূলক বরিশালে ভালো ভোট পেয়েছে দলটি। তিনি একাই বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। দুটি আসনেই হেরেছেন তিনি। এর মধ্যে বরিশাল-৫ আসনে ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হলেও এবং বরিশাল-৬ আসনে ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট পেয়ে হয়েছেন তৃতীয়।

অন্যদিকে বরিশাল-১ আসনে ৬ হাজার ৮৪৬ ভোট পেয়ে মো. রাসেল সরদার, বরিশাল-২ আসনে ৬ হাজার ২১ ভোট পেয়ে মোহাম্মাদ নেছার উদ্দিন, বরিশাল-৩ আসনে ১৬ হাজার ৩২৫ ভোট পেয়ে মুহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম জামানত হারিয়েছেন।

বরিশাল-৩ আসনে চরমোনাই পীরের আরেক ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। ফলে জামানত বাজেয়াপ্ত না হলেও বড় ব্যবধানে হেরেছেন তিনি।