Image description
♦ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ♦ তৈরি হচ্ছে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ♦ তালিকাভুক্ত কারবারিদের বিরুদ্ধে দ্রুতই অ্যাকশন

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে সব করা সম্ভব। মাদকের টাকা না পেয়ে পিতা-মাতাকে খুন করার খবর পত্রিকার পাতায় অহরহই দেখা যায়। এই ভয়াবহ মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য নতুন সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসহ অনেক ক্ষেত্রেই ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এই কর্মপরিকল্পনা পৌঁছে যাবে সংস্থাগুলোর কাছে। মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনা পেয়ে নড়েচড়ে বসেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। মাদকের রুট, মাদকাসক্ত, মাদক কারবারি, সরকারি-বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্র এবং বিভাগভিত্তিক মাদক উদ্ধার ও মামলার পরিসংখ্যান হালনাগাদের কাজ শুরু হয়েছে।

এদিকে ডোপ টেস্ট বিধিমালা বাস্তবায়ন হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজকে মাদকমুক্ত করতে এই বিধিমালা জাদুর কাঠির মতো কাজ করতে পারে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি চাকরি, স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে সরকার।

গত বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়ার পর গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। কর্মপরিকল্পনা সাজাতে মাদক নির্র্মূলের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। গত সোমবার জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ (ডোপ টেস্ট) বিধিমালাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিধিমালা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত শনাক্ত হওয়ার পর নির্ধারিত চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানানোও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিয়োগে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। পরীক্ষায় ফল পজিটিভ এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী কেবল সরকারি চাকরি নয়, বরং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, যানবাহন চালনার লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্ট করা যাবে। এ ছাড়া বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মী এবং যাদের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের প্রাথমিক সন্দেহ বা অভিযোগ থাকবে, তাদের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষা কার্যকর হবে। স্থলযানের পাশাপাশি নৌযান ও আকাশযান চালকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে মাদক কারবারিদের মধ্যে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কারবারিদের গ্রেপ্তারে অনেকটাই অসহায় ছিল সংস্থাগুলো। এজন্য মন্ত্রণালয়ে খুচরা কারবারিসহ প্রভাবশালী গডফাদারদের তালিকা দেওয়া হবে। যাতে সত্যিকার অর্থে মাদক নির্মূল করা যায়। সূত্র আরও জানায়, সরকার মনে করছে- দেশে সব অপরাধের প্রধান রসদ হিসেবে কাজ করছে মাদক। খুনাখুনি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই যার সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা নেই। এজন্য সব ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে মাদক নির্মূলে সর্বোচ্চ ড্রাইভ দেওয়া হবে। দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে তালিকাভুক্ত কারবারিদের। কেননা মাদক নিয়ন্ত্রণে থাকলেই অনেক অপরাধ কমে যাবে। সামাজিক অস্থিরতাও কমে আসবে। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পাবে যুবসমাজ। মাদকবিরোধী সংগঠন মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার জিরো টলারেন্সের কথা বলে ৫ শতাংশ কার্যক্রমও করেনি। তালিকা থাকার পরও নিজ দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করেনি। ফলে ওসব মাফিয়া চক্রের প্রভাবে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় কোটি। এ সমস্যা সমাধানে সরবরাহ, চাহিদা ও ক্ষতি হ্রাসের বিষয়ে কাজ করতে হবে। ডোপ টেস্ট এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ডোপ টেস্ট করা যাবে না। এতে মাদকাক্ত আগেই সতর্ক হয়ে ২-৩ দিন আগে মাদক খাওয়া বাদ দিয়ে দিলে আর ধরা পড়বে না। তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করলে সেই সুযোগ কেউ পাবে না। বিশেষ করে ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে চালকরা মাসকাসক্ত থাকায়। এসব প্রাণহানিও কমে আসবে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে সব ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কার্যকর হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার মাদক নিয়ে যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে- সেটি সর্বোচ্চ সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। সরকারের এই সদিচ্ছা যদি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়- তাহলে আমরা একটি মাদকমুক্ত সমাজ পাব। তবে খেয়াল রাখতে হবে- এ কার্যক্রম হতে হবে প্রভাবমুক্ত। যদি কোথাও প্রভাব কাজ করে তাহলে সমাজ মাদকমুক্ত হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরবরাহ বন্ধে ব্যর্থ হওয়া থেকে ডোপ টেস্টের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। এটি স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হলে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণের আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। আজ (গতকাল) মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ওই কর্মপরিকল্পনা আমরা পেলে তখন অধিদপ্তরের পরিকল্পনা সাজানো হবে। এমনিতে আমাদের অভিযান জোরদার রয়েছে। নতুন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে আমরা প্রস্তুত। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডোপ টেস্ট বিধিমালা হওয়ায় আইনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এই বিধিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে মাদকের চাহিদা কমবে।