১৮ মাস পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ সময়ে মূলত আগের সরকারের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে একটি ভিন্ন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। যেখানে ভারত থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন হয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে। যেমনটা হয়েছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, আমরা জিয়াউর রহমান সাহেবের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরে যাচ্ছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সেই চেষ্টা ছিল। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে যে নতুন বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মূলত ফিরে যাচ্ছে পুরোনো পররাষ্ট্রনীতিতে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। যা শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় স্থবিরতায়। তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বেশ কয়েকবার স্বীকার করেছেন যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে। সম্পর্কের পারদ এমন উচ্চতায় পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারতেরও ট্যুরিস্ট ভিসা ৫ আগস্টের পর থেকে এখনও বন্ধ রয়েছে। যদিও এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত বলছে দ্রুত ভিসা চালু হবে।
কেমন ছিল জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়কাল ছিল ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই নীতি থেকে সরে এসেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সক্রিয়ভাবে উন্নত করেন। যার ফলে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ৭৩৫ মিলিয়ন ডলার মার্কিন সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষ্য ছিল—বৈশ্বিক বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন অবস্থান নিশ্চিত করা। শীতল যুদ্ধের সম্পর্ককে বাংলাদেশের সুবিধার জন্য কাজে লাগানো। ভারত থেকে অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করা এবং বাংলাদেশের স্বার্থ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশ ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করতেন।
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির একটি ভিত্তিপ্রস্তর ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কারণে সেসব অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন হয়। ভারতের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা তখনও থাকলেও তার নীতির লক্ষ্য ছিল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আধিপত্য ও অধীনতা থেকে সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে রূপান্তরিত করা।
সার্কের ধারণা তৈরি হয় সেই আমলেই। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও জিয়াউর রহমানকে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘সার্ক’ নামে একটি আঞ্চলিক গ্রুপের ধারণার কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ১৯৮০ সালে তিনি এই ধারণার জন্ম দেন এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ বাড়ান। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল।
জিয়াউর রহমানের আমলে একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন ছিল বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি অস্থায়ী আসন অর্জন করা।
ঢাকার সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জিয়াউর রহমান মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি ইরাক ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসিতে প্রশংসিত হয়েছিলেন। জিয়া সরকার যে নীতি অনুসরণ করেছিল, তাতে ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, সোভিয়েতপন্থি জোট থেকে বাংলাদেশকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পক্ষে ছিল। এ কারণে পশ্চিমা দেশগুলোও তাকে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছিল।
ভারতের সঙ্গে নীতি কতটুকু বদলাতে পারে
বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব পাবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেও উল্লেখ করেছেন সেই কথা। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আপনার পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থকে রক্ষা করে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবো।” একইসঙ্গে তিনি ‘সার্ক’কে পুনরুজ্জীবিত করার কথাও বলেছেন।
ভারতের সঙ্গে টানাপড়েন চলছে ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে। সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মতে, এক ধরনের স্থবিরতা ছিল সম্পর্কে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় ভারতকে বেশ সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি ফোন করে কথা বলেছেন। ঢাকায় শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকারকে পাঠিয়েছেন চিঠি দিয়ে, সেখানে তিনি পরিবারসহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নে তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
অপরদিকে সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস সব ধরনের ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসবে বলে জানিয়েছেন। এতে স্পষ্ট যে ভারত সম্পর্কের উন্নতি চায়।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সমান সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে, স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে কোনও কাজ করা উচিত হবে না।
সাবেক ওই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে কাজ করতে চাইলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে পররাষ্ট্রনীতিতে। শুধু অঞ্চলভিত্তিক নয়, দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কূটনীতিতে সমতা ফেরাতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘‘ফরেন পলিসিতে ‘প্রথম বাংলাদেশ’ মানে বাংলাদেশের স্বার্থ কোনোভাবেই খণ্ডিত না হয়, বা নষ্ট না হয় সেটা। বিএনপির বা জিয়াউর রহমানের যে পররাষ্ট্রনীতি, সেটা তিনি বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করবেন বলে মনে হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে।’’
আগের পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে, কিংবা নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে কী হবে, সেটা দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘‘কতগুলো জিনিস কোনোভাবেই আমরা চাইলেও পরিবর্তন করতে পারবো না। একটা হলো, বিশ্ব একটা বহুমাত্রিক কাঠামোর দিকে যাচ্ছে। সেটা হয়তো আমেরিকা পছন্দ করছে না বা চাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের অর্থনীতির যে কাঠামো, সেখানে ওই বহুমাত্রিক কাঠামোর সঙ্গে আমরা সম্পৃক্ত। যেমন- অর্থনীতির ব্যবসাটাই হচ্ছে কিছু কিছু দেশ থেকে আমরা অল্প দামে কাঁচামাল আনি এবং ওটাকে প্রসেস করে অন্য দেশে আমরা সারপ্লাস তৈরি করতে পারি। এখন ওই সারপ্লাস পুরোপুরি যদি ওই দেশেই খরচ করতে হয়, তাহলে তো আমার উন্নয়ন ব্যাহত হবে। কারণ আমি অন্য কাঁচামাল কিনতে পারবো না। আমি কিছু করতে পারবো না। সেই জায়গায় একটা প্রচণ্ড পেশাদারত্ব দরকার। বোঝানো দরকার যে আমরা অন্য দেশের সম্পর্ক গড়ার পেছনে নিরাপত্তার কোনও বিষয় নেই। বরং পুরোটাই উন্নয়নের বিষয় এবং বেশ কিছু দেশ এভাবে বড় আকারেই তাদের উন্নতি করতে পেরেছে। তো সেটা করার জন্য যে পেশাদারত্ব দরকার, যে জ্ঞান অভিজ্ঞতা দরকার, সেটা দেখা দরকার, কাজে লাগাতে পারি কিনা। কারণ এখানে পেশাদারত্বের বিশাল দরকার আছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘দুই দেশের পাসপোর্ট রাখাও বন্ধ করা দরকার। এটা ভারতে নেই, চীনে নেই, সিঙ্গাপুরে নেই, থাইল্যান্ডে নেই। তাহলে আমরা কেন দিচ্ছি।’’
‘ফরেন পলিসিতে ভারসাম্য রক্ষা করা একটা ভুল ব্যাখ্যা’ বলে মনে করেন ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘‘আমরা আসলে ব্যালেন্স করতে কখনও চাইনি। কিন্তু ওটা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আমাদের যেটা দরকার সেটা হলো, কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে যেন তৃতীয় দেশের ওপর নির্ভর করে না হয়।’’