ওমরাহ্ হজ পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে মাইক্রোবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ভাটরার পাঁচমুখী এলাকার একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ ও নির্বাক বৃদ্ধা মা। মায়ের আকুতি- এনে দে আমার বুকের মানিক রে। এই কথা বলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন নিহত মিজানুর রহমানের মা খুকি বেগম। চেতনা ফিরে এলে আবার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকেন ছেলের বউ ও তিন নাতনি মোহনা আক্তার, সুবাহ আক্তার ও ফাইজা আক্তারের জন্য। তবে ফাইজা আক্তার বেঁচে থাকলেও তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
একইভাবে মিজানের বাবা সহিদ উল্যাহ বলেন, ওমরাহ্ শেষে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাসখানেকের মধ্যে বাড়ি ফেরার কথা ছিল মিজানুরের। কিন্তু এখন সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে গেল আমাদের। এখন কি হবে? কাকে নিয়ে বেঁচে থাকবো? পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো গ্রাম। এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানায়, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ভাটরার পাঁচমুখী এলাকার খুকি-শহিদ উল্যাহ দম্পতির দুই ছেলে-দুই মেয়ের মধ্যে মিজানুর রহমান মেজো। পারিবারের আর্থিক সচ্ছলতা কাটাতে কয়েক বছর আগে সৌদি আরবে যান মিজানুর। সেখানে গিয়ে খাবারের হোটেলের ব্যবসা শুরু করেন। এতে করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে কাটছিল তাদের সংসার। গত কয়েকদিন আগে দেশে আসেন মিজান। চলতি মাসের ৩রা ফেব্রুয়ারি ওমরাহ্ হজ করতে স্ত্রী মেহের আফরোজ সুমি ও তিন কন্যা ফাইজা আক্তার, মোহনা আক্তার ও দেড় বছরের কন্য সুবাহ আক্তারকে নিয়ে সৌদি আরবে যান। ১৫ই ফেব্রুয়ারি ওমরাহ্ হজ শেষ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন মিজানুর রহমান। এ সময় গভীর রাতে সৌদি আরবের আবহা এলাকায় পৌঁছালে মাইক্রোবাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান দুই কন্যা, স্ত্রীসহ মিজানুর রহমান ও গাড়িচালক জিলানী। অপর আরেক কন্যা ফাইজা আক্তার গুরুতর আহত হয়। তবে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছালে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক ঘটনা। এতে করে পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। কোনোভাবে এই মর্মান্তিক ঘটনা মেনে নিতে পারছে না পরিবার। একইসঙ্গে সবাইকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা যেন পাগলপ্রায়। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার। স্বজন ও এলাকাবাসী জানায়, মিজানুর রহমান ছিলেন এলাকার নম্র-ভদ্র স্বভাবের মানুষ। পাশাপাশি গরিব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন তিনি। তার ও পরিবারের এমন মৃত্যু কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। তাদের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দ্রুত তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান স্বজনরা।
মিজানুর রহমানের ভাই বাহারুল আলম বলেন, মিজানুর রহমান দীর্ঘদিন থেকে সৌদি আরবের আবহা শহরে হোটেল ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। চলতি মাসের ৩রা ফেব্রুয়ারি মিজানুর রহমান তার স্ত্রী মেহের আফরোজ সুমি, তিন কন্যা- মোহনা, ফাইজা ও ছোট মেয়ে সুবাহকে পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরবে নিয়ে যান। সৌদি আরবের সময় রোববার রাত প্রায় ৩টায় পবিত্র হজ পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে আবহা এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন। এতে পরিবারের চারজনসহ ৫ জন নিহত ও একজন গুরুতর আহত হয়। রামগঞ্জ থানার ওসি ফিরোজ উদ্দীন চৌধুরী জানান, মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলে সার্বিক সহযোগিতা করবো। এ ঘটনায় রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারাশিদ বিন এনামকে জানান, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক সম্রাট খীসা এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, পরিবারের পাশে রয়েছে প্রশাসন। দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহগুলো আনতে মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।